আমার মেডিকেল কলেজ জীবন-৩ - ভালোবাসার কবি ...

আমাদের সাথে নেপালী ভর্তি হয়েছিলো আট জন, পাঁচ জন ছেলে, তিন জন মেয়ে। বাজিতপুরে সবসময় প্রতি ব্যাচে অফিসিয়ালী পঁচিশ জন ছেলে আর পঁচিশ জন মেয়ে (বাংলাদেশীদের মধ্যে) –এভাবে ভর্তি করানোর নিয়ম থাকলেও তা কখনো হয়নি। যেমন আমাদের ব্যাচেই মেয়েদের সংখ্যা ছেলেদের চেয়ে বেশী ছিলো। ব্যাপারটা নিয়ে আমরা খুব খুশিই ছিলাম, একলা আর চলতে হবে না, রিডিং পার্টনার পাওয়া খুব একটা কষ্টের হবে না।

সিনিয়রদের পরামর্শমতো খুব দ্রুতই অনেকে মাঠে নেমে গেলো। কিন্তু আমি গোল দেবার আগেই গোল খেয়ে বসলাম। শিফা বয়সে বড় (যদিও আজকাল এটা কোনো ব্যাপার নয়) আর বিবাহিত জেনে ওর সাথে ভাই-বোনের সম্পর্কটাই আমার কাছে নিরাপদ মনে হয়েছিলো! দেখা গেলো এরকম এক বছরের সিনিয়র আরো কিছু বোন হয়ে গেলো আমার। মনে মনে চিন্তা করছিলাম, কেনো বললাম না আমিও ড্রপ দিয়েছি। এরপর বন্ধুদের আড্ডায় একজনকে পছন্দ করার ঘোষনা দিলাম (তখন আমরা বলতাম বুকিং দিয়েছি)। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি সে তার হৃদয়টা আগেই ঢাকাতে কাউকে দিয়ে এসেছে। এক বড় ভাইয়ের সাথে মনের কষ্ট শেয়ার করলে আমাকে অভয় দেওয়া হলো, এসব সম্পর্ক টিকবে না, কথায় আছে না “চোখের আড়াল হয়ে গেলে মনেরও আড়াল হয়ে যায়”, অতএব অপেক্ষা আর অপেক্ষা। অপেক্ষার প্রহর বড়ই দীর্ঘ মনে হতে লাগলো।

অপেক্ষা করতে করতে কখন যে একমাস পেরিয়ে গেলো তা বুঝতেই পারলাম না। এ সময় ঠিক হলো বড় ভাইয়া-আপুরা আমাদের নবীন বরণ দিবে, সেখানে আমাদের নবীনদেরও কিছু করতে হবে। শুরু হলো প্রতিদিন সন্ধ্যায় কলেজের এক রুমে নবীন বরণ অনুস্ঠানের জন্য সাংস্কৃতিক চর্চা। আমরা যারা কিছুই জানতাম না তারা গিয়ে এক কোনায় বসে সবার গান-বাজনা শুনতাম। হঠাৎ করে “ঐ ঝিনুক ফোঁটা সাগর পাড়ে আমার জানতে ইচ্ছে করে, আমি মন ভিজাবো ঢেউয়ের তালে তোমার হাতটি ধরে” গানটি শুনে তাকিয়ে দেখি মৌ্রিন। আমার খুব ইচ্ছে হলো ওর হাতটি ধরে সেই ঝিনুক ফোঁটা সাগর পাড়ে ঢেউয়ের তালে মন ভিজাতে।

বড় ভাইয়ারা পরামর্শ দিলো একটা স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করতে, তাতে যদি সাগর পাড়ে না হোক, অন্তত লেকের পাড়ে হাত ধরা যায়। দুই-তিন রাত জেগে, চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে বহু কষ্টে কবি হবার অপচেষ্টা শুরু করলাম। খোঁজ নিতে শুরু করলাম কিভাবে দ্রুত মাথা কেশরাজিতে পূর্ণ করা যায়। ওর ভালো লাগা, খারাপ লাগার খবর নিতে লাগলাম।

অনুস্ঠানের দুই দিন আগে কবিতার একটা কাঠামো দাঁড় করাতে পারলাম। এরপর শুরু হলো আসল কাজ। আমাকে আবৃত্তিকার বানানো। শান্তু ভাইয়া আর নাসরীন আপু আমাকে নিয়ে যুদ্ধ শুরু করলেন, ঘষা-মাজা শুরু হলো আমার গলার। শান্তু ভাইয়া মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলতেন, “ঢাকা কলেজে কি করতি? একটা কবিতা ঠিকমতো আবৃত্তি করতে পারছিস না, তাও আবার নিজের লেখা?” আমি স্মিত হেসে লাজুক কন্ঠে বলতাম, “ঢাকা কলেজে তো শুধু তাস খেলতাম আর একটা বাজলেই ভিকারুন্নেসার দিকে দৌঁড়াতাম”। আমার এই সহজ সরল উত্তর শুনে ভাইয়ার মনে হয় নিজের মাথার চুল ছেঁড়া বাকী থাকতো।

অবশেষে আসলো সেই দিন। সকাল থেকেই আমরা নবীনরা সবাই উত্তেজিত, আমি তো আরো বেশি। অনুস্ঠান শুরু হলো সন্ধ্যা থেকে। প্রিসিপাল স্যার, ভাইস-প্রিন্সিপাল স্যার, বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের স্যার-সবাই এসে উপস্থিত। আমার একবার মনে হলো উঁনাদের সামনে আমি কিভাবে ভালোবাসার কবিতা আবৃত্তি করবো। ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ শুনতে পেলাম শান্তু ভাইয়া মাইক্রোফোনে বলছে, “ এখন স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করবে আরো একজন নবীন – নিয়াজ”।

মঞ্চে উঠার আগে একটু ঘাবড়িয়ে গিয়েছিলাম আমি। শিফা আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে ভরসা দিলো, “ওরিয়েন্টশনের দিন বলতে পেরেছো, আজকেও পারবে”। আমি চোখ বন্ধ করলাম। মায়ের হাসি মুখটাই ফুটে উঠলো আমার সামনে। সাহস পেলাম, চোখ খুললাম, এরপর বলা শুরু করলাম—–

“ সেদিন সকাল বেলায় ভোরের সূর্য
জানালায় উঁকি দিয়ে
কানে কানে আমায় বললো,
‘তুমি যখন তার কাছে যাবে,
একটি লাল গোলাপ নিয়ে যাবে’ ।
আমি টকটকে লাল গোলাপের কাছে গেলাম।
গোলাপটি আমাকে দেখেই বলে উঠল,
‘আমি কাঁটাযুক্ত, তুমি রজনীগন্ধ্যার কাছে যাও’।
আমি একগুচ্ছ রজনীগন্ধ্যার কাছে গেলাম।
রজনীগন্ধ্যার একটি স্টিক আমাকে
সাদরে বরণ করে বললো,
‘আমি অতি সাধারণ, তুমি বরং
স্বর্ণ অশোকের কাছে যাও’।
বোটানিক্যাল গার্ডেনের কোনো এক প্রান্তে-
আমি স্বর্ণ অশোকের কাছে গেলাম।
‘আমি রসহীন, তুমি যাও তার কাছে
দুর্লভ পারুল ফুলের মালা নিয়ে’।
রমনা পার্কে কারো অযত্ন, অবহেলায় বেড়ে উঠেছে
দু’টি পারুল গাছ, তা কেউ জানে না।
আমি সেই পারুলের কাছে গেলাম।
কিন্তু হায়! সমস্ত পারুল ফুল ঝরে পড়ে আছে।
শিশির সিক্ত নয়নে যেই আমি ফিরে আসবো
তখনই তারা কথা বলে উঠলো,
যেন আমায় বললো-
‘তুমি তার কাছে যাও-
পৃথিবীর সেরা তিনটি শব্দের ডালি সাজিয়ে
আমি তোমাকে ভালোবাসি’”।

—সেই থেকে আমি ভালোবাসার কবি।

(আমি মেডিকেল কলেজ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লেখা শুরু করার পর যাদের নাম এসেছে, চেষ্টা করেছি তাদের পূর্বানুমতি নেবার জন্য। এরপরও কাউকে কাউকে আমি খুঁজে পাইনি, এই লেখা পড়ে কারো কোনো বক্তব্য থাকলে সে আমার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারে।)

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!