আমার মেডিকেল কলেজ জীবন-৬ - দাদা, নীল পরী আর একটি মৃত্যু

মাঝে মাঝে নিজের কাছে প্রশ্ন করি কোন সময়টা আমার কাছে সবচেয়ে আবেদনময়ী? স্কুল জীবন? কলেজ জীবন? না কি মেডিকেল কলেজ-এর সময়টুকু? উত্তর খুঁজে পাই না। একসময় হাল ছেড়ে দেই। কিন্তু একটা জিনিস বুঝতে পারি মেডিকেলের পরিচিত মুখদের আমি কখনো ভুলে যেতে পারবো না, চাইলেও না।

ভাস্কর, ভাস্কর শশাঙ্ক ধর। আমাদের ক্লাসের রোল নম্বর এক। গোঁড়া ব্রাক্ষ্মন। আমরা দাদা বলে ডাকতাম। সেই দাদার কথা-বার্তায় একটু কলকাতারও টান ছিলো, মনেও হয়তোবা। ভাস্কর যখন ডাইনিং-এ খেতে বসতো-ওর খাওয়ার প্লেট কেউ ছুঁয়ে ফেললে, সেই খাবার আর সে খেতো না। আমরা প্রায় সময় ওকে বাধ্য করতাম হাসপাতাল ক্যান্টিনে খেতে, কারণ কেউ না কেউ খাবার সময় ওর প্লেট ছুঁয়ে দিতো।

লিন্ডা, সোহানিয়া আক্তার লিন্ডা। আমাদের ব্যাচের অন্যতম ফ্যাশনেবল মেয়ে। একদিন কি প্রসঙ্গে যেনো বলছিলো, ছেলেদের সিগারেট খাওয়াটা তার কাছে খুব স্টাইলিশ্ট লাগে। আমরা যারা নন-স্মোকার ছিলাম, একটু হতাশই হলাম- স্টাইল সচেতন বলে নয়, ওর সাথে এফেয়ার করতে পারবো না বলে। সেই লিন্ডা এনাটমির প্রথম কার্ড পরীক্ষা দিতে আসলো চমৎকার একটা নীল পোশাকে, আমাদের অনেকেরই চোখ ঝলসে উঠেছিলো, পরীক্ষার মানসিক প্রস্তুতি আর কি নিবো, মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি নীল পরীর দিকে। হাই ফকির স্যার লিন্ডার ভাইভা নিচ্ছিলেন। খুব সহজ সহজ প্রশ্ন করছিলেন। মনে হচ্ছিল, কেনো মেয়ে মানুষ হয়ে জন্মালাম না। কে যেন বলেছিলো, মেডিকেলে পাশ করতে চারটা L লাগে, Labour, Luck,Lubrication আর Lady। ভাইভা শেষ করে যেই লিন্ডা চলে আসবে তখনই হাই ফকির স্যার বলে উঠলেন,
“মা-মনি, তুমি নীল পোশাক পরে এসেছো। তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে। কিন্তু তুমি নখে লাল নেইল-পলিশ লাগিয়েছো। তুমি করবে কি, নীল রং লাগাবে, তাহলে আরো সুন্দর লাগবে”। সেদিন থেকে লিন্ডার ‘ফ্যাশন সচেতন মেয়ে’ উপাধিতে একটু দাগই পড়ে গেলো!

শাওন, রিফাত সুলতানা শাওনকে বলা হতো আমার বনলতা সেন। না, বনলতার কোনো বর্ণনাই তার সাথে খাটবে না। কলেজের কোনো এক প্রোগ্রামে কোরিওগ্রাফিতে আমি আর শাওন একসাথে ছিলাম, আমাদের গানটি ছিলো ‘নাম রেখেছি বনলতা, যখন দেখেছি’। মিতু নামের দুজন ছিলো আমাদের ব্যাচে। যার রোল নম্বর আগে, সে ছিলো মিতু-১। ওকে আমরা আরেকটি নামে ডাকতাম, ‘ঝাকু মিতু বা কার্লি মিতু’, চুল কার্ল করা ছিলো বলেই। মিতু-২ কে আমরা ডাকতাম ‘ঘোমটা পার্টির মিতু’, না, মিতু-২ কখনো বোরখা পড়তো না বা ঘোমটা দিতো না। ওদের চারজনের একটা ছোট দল ছিলো, সবসময় একসাথে থাকতো, গ্রুপের কেউ-ই ঘোমটা দিতো না, তারপরও কেনো ঘোমটা পার্টি ডাকা হতো আমি এখনো জানি না।

মাসুদ ছিলো আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। প্রথম দিকে ওর মাধ্যমেই আমার সাথে সিনিয়র ভাইয়াদের ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠে। জামিল ভাইয়া, সজল ভাইয়া, কমল ভাইয়া, কোয়েল ভাইয়া আরো অনেকে। কোয়েল ভাইয়া একটু লাজুক ধরনের ছিলো, কম কথা বলতো।গায়ের রং শ্যামলা, কিন্তু লিকলিকে নয়, ব্যায়াম করা স্বাস্থ্য।ক্যাম্পাসের কেউ তাকে অপছন্দ করতো না। কমল ভাইয়া খুব সুন্দর গান গাইতে পারতো, বিশেষ করে হাসানের গানগুলো। একদিন রাত ১০ টা থেকে সজল ভাইয়া আমার রুমে এসে আড্ডা মারা শুরু করলেন, সেদিন আমার রুমমেটরা কেউ ক্যাম্পাসে ছিলো না। আমার সাথে সারারাত গল্প করলেন, একবারও ঘুমের কথা বলতে পারিনি। যখন ফজরের আজান দিলো, ভাবলাম এখন মনে হয় ভাইয়া চলে যাবে। চলেও গেলেন তিনি, কিন্তু দশ মিনিট পরে রেডি হয়ে এসে আমাকে বললেন, ‘এতো সুন্দর সকাল! চলো জগিং করে আসি’, আমি তখনো কাউকে ‘না’ বলতে শিখিনি!

‘এতো সুন্দর সকাল! চলো জগিং করে আসি’

আমাদের সাপ্তাহিক ছুটি ছিলো মঙ্গলবার। যারা ঢাকা যেতো না, বিভিন্নভাবে ছুটির সময়টা কাটাতো। কেউ কেউ ট্রেনে করে কিশোরগঞ্জ চলে যেতো, কেউবা ভৈরবে। আমি থাকতাম ঘুমের ঘোরে। একদিন এমনি এক ছুটির দিনে সন্ধ্যার সময় ঘুম দেবতার কাছ হতে মাত্র ছুটি পেয়ে পেট পূজা করতে ক্যান্টিনে গেলাম। বাইরে হঠাৎ শোরগোল শুনে ক্যান্টিন হতে বের হয়ে দেখি হাসপাতালের ইমার্জেন্সীর সামনে লোকে লোকারণ্য। ইমার্জেন্সীতে ঢুকেই চুপ হয়ে গেলাম। কোয়েল ভাইয়ার পা কাটা পড়েছে ট্রেনের চাকার নিচে। ওনারা চার বন্ধু ছুটির দিনে কিশোরগঞ্জে গিয়েছিলেন, আসার সময় সবাই ট্রেনের ছাদে মজা করে আসছিলেন। ট্রেন বাজিতপুর আসার পর ছাদ থেকে লাফ দিয়ে নামার সময় কোয়েল ভাইয়ার পা চাকার নিচে পড়ে যায়। ওনাকে দ্রুত ঢাকার সিএমএইচে পাঠিয়ে দেওয়া হলো।

ঠিক ওই সময়টাতে আমার রুমমেট ফয়েজ-এর সাথে আমার মনোমালিন্য চলছিলো। প্রথম কারণ, ত্বন্বীর সাথে সম্পর্কটা আগে থেকে জানতাম না, দ্বিতীয় কারণ, আমি রুমে শুনতাম রবীন্দ্র আর নজরুলের গান, ফয়েজ শুনতো হিন্দী, তাও জোরে ভলিউম দিয়ে। আমাদের মনোমালিন্য দূর করতে এগিয়ে আসলেন জামিল ভাইয়া। রাতের বেলা উনি রুমে এসে প্রথমে আমাকে বললেন রবীন্দ্র সঙ্গীত ছাড়তে। আমি আড়চোখে ফয়েজের দিকে তাকিয়ে খুব ভাব নিয়ে ‘ভালোবাসি ভালোবাসি’ ছাড়লাম। জামিল ভাইয়া গানটা শোনার পরে বললেন, ‘হুম! খুবই সুন্দর গান। ফয়েজ তোর কাছে কেমন লেগেছে?’ বড় ভাইয়ের প্রশ্নে ফয়েজ থতমত খেয়ে বলল, ‘ভালো’, আমার বত্রিশটা দাঁতই তখন দেখা যাচ্ছিলো খুশিতে। এবার তিনি বললেন, ‘ফয়েজ, একটা হিন্দী গান শোনাতো, ঐ গানটা শোনাও—শ্রাবন বারসে তারসে দিল’। পরবর্তী ঘটনা ভাইস ভারসা। সেই থেকে আমি হিন্দী গান শুনছি, ফয়েজ রবীন্দ্র সঙ্গী্ত শুনছে।

এর ঠিক দুই দিন পর শুনতে পেলাম-কোয়েল ভাইয়া সিএমএইচে মারা গেছেন। ক্যাম্পাসে আমাদের তখন প্রায় ছয় মাস।

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!