প্রাচীন যুগে যখন রাজায় রাজায় যুদ্ধ হতো তখন তীরন্দাজ বাহিনীর বিশাল ভূমিকা থাকতো। যুদ্ধের শুরুতে যখন একপক্ষের পদাতিক বাহিনী অন্য পক্ষে্র দিকে এগিয়ে আসতো তখন সর্বপ্রথম তীরন্দাজ বাহিনীই তীর নিক্ষেপ করে শত্রুপক্ষে্র কিছু পদাতিক কমিয়ে দিতো। একসাথে যখন অনেকগুলো তীর ছোঁড়া হতো, সেটা একটা দেখার মতো ব্যাপার ছিলো। এখনকার যুদ্ধে তীরন্দাজ বাহিনী নেই। তাই তীরবিদ্ধ হলে কেমন অনুভূতি হয়, এখন তা কেউ জানে না। তীরন্দাজীটা এখন খেলার মইয়দানেই আছে। ইদানীং আমাদের দেশে ঢাকা শহরে জাতীয় স্টেডিয়ামের পাশে গেলে তীরন্দাজদের প্রশিক্ষন দেখা যায়। তীরন্দাজ নিয়ে এতো কথা বলার কারণ, আমি জানি তীরবিদ্ধ হলে কেমন লাগে। চপলা, চঞ্চলা হরিনীকে তীরবিদ্ধ করতে গিয়ে নিজেই যখন বড়ো ভাই হয়ে কুপোকাৎ হয়ে গেলাম, তখন ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের তীরের আঘাতগুলো সহ্য করতে না পেরে তিন-চার দিনের জন্য ক্যাম্পাস থেকে পালিয়ে গেলাম আমি, তাও আবার সমুদ্রের কাছে।
সমুদ্রের বিশাল লোনা জলরাশিতে অবগাহিত হয়ে যখমটাকে নিরাময় করে যখন ক্যাম্পাসে ফিরে এলাম, ক্যাম্পাসে তখন যুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। এই যুদ্ধ রাজায় রাজায় না, এইযুদ্ধ ব্যাট আর বলের। আন্তঃবর্ষ ক্রিকেট প্রতিযোগিতা। এবারো ক্যাপ্টেন নির্বাচন নিয়ে সমস্যা দেখা দিলো। আমাদের ফুটবলের ক্যাপ্টেন ছিলো ফয়েজ। কিন্তু ক্রিকেটের জন্য নির্বাচনে দাঁড়ালো সেই ববি আর পাশা। দুই জনেই খুব ভাল খেলে, দুই জনেরই ক্রিকেট জ্ঞান অসাধারণ। ববির বাড়ি ছিলো চট্টগ্রামে। সে প্রায়ই বলতো, ‘আমি নান্নু (মিনহাজুল আবেদীন নান্নু) ভাইয়ের সাথে ক্রিকেট খেলেছি।’ ওর এই কথাই ওর জন্য বুমেরাং হলো। গোপন ভোটাভুটিতে পাশা ক্যাপ্টেন হয়ে গেলো। কিন্তু আমরা যখন প্রাকটিসে গেলাম, দেখা গেলো ববি আর ওর ভোটাররা মাঠে গেলো না। দুই দিন পর আবার রাতের বেলায় আমাদের জরুরী সভা। সেখানে ববি আবেগাপ্লুত হয়ে রাজনীতিবিদদের মতো এক জ্বালাময়ী ভাষন দিয়ে বিরোধীদলের মতো আগাম মধ্যবর্তী নির্বাচন দাবী করলো। তানভীর নামে আমাদের এক চরমপন্থী বন্ধু ছিলো। সে সরকারী দলের মতো বলে ফেললো, ‘ববির বিরুদ্ধে যদি একটা কলা গাছও নির্বাচনে দাঁড়ায়, তাহলে কলা গাছ জিতবে।’ কিন্তু দলের স্বার্থে, ব্যাচের স্বার্থে পাশা সোনিয়া গান্ধীর মতো ক্যাপ্টেন্সী থেকে সরে দাঁড়ায়। পরদিন থেকে ববির ক্যাপ্টেন্সীতেই আমরা প্রাকটিস শুরু করি।
এর আগে মোট চারবার আন্তঃবর্ষ ক্রিকেট প্রতিযোগিতা হয়েছিলো। প্রতিবারই জে-৪ ব্যাচ কোনো রকম স্থূল কারচুপি বা পুকুর চুরি ছাড়াই অপরাজিতভাবে চ্যাম্পিয়ান হয়েছিলো। কিন্তু এই বছর জে-৪ ব্যাচ না থাকাতে বাকী সবগুলো ব্যাচই শিরোপার দাবীদার ছিলো। প্রাকটিসে দেখা গেলো ব্যাটিং বোলিং-এর চেয়ে আমি ফিল্ডিং-এ জন্টি রোডস। মনোয়ার আর ফয়েজ বলতো বাস্তব জীবনে যেহেতু কোনো ক্যাচই ধরতে পারিনি, তাই মাঠেও একই দশা হবে। তবে আমি নিশ্চিত ছিলাম একাদশে আমি থাকবোই। আমি বোধহয় ভুলে গিয়েছিলাম দলের ক্যাপ্টেন ববি। তাই খেলার দিন দেখা গেলো আমি দ্বাদশ খেলোয়াড়। মাঠ ভর্তি সুন্দরী ললনা, বিশেষ করে সেই চপলা হরিনীর সামনে দিয়ে যখন মাঠে তোয়ালে আর পানির বোতল নিয়ে দৌড় দিতাম, মনে হতো কেনো যে ব্রিটিশরা এই খেলা আমাদের দেশে এনেছে!
প্রথম দুই খেলায় আমি মাঠে নামার সুযোগই পাইনি। এর মধ্যে একটিতে আমরা হেরে যাই, আরেকটিতে আমরা জিতি। তৃ্তীয় খেলায় আমরা দ্বিতীয় ইনিংসে ফিল্ডিং করছিলাম। আমাদের একজন একটু আহত হলে আমি প্রতিযোগিতায় প্রথম বারের মতো মাঠে নামি। আমার জন্টি রোডস হয়ে উঠাতে সে ম্যাচ আমরা জিতে যাই। শেষ ম্যাচটাতে জিতলেই আমরা ফাইনালে। আগের ম্যাচের দুর্দান্ত ফিল্ডিং-এর জন্য একাদশে ঢুকে গেলাম। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে আমাদের ব্যাটিং লাইন আপে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের মতো মড়ক লেগে গেলো। পচিঁশ ওভারের ম্যাচে পনের ওভারের মধ্যেই চুয়াত্তর রানে নয়বার উইকেট ভূপতিত হয়। শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আমি মাঠে নামি। শেষ জুটিতে আমার সাথে ছিলো নেপালী নিরাজন, ও মোটামুটি ব্যাট চালাতে জানতো। আমার কাছে এসে নিরাজন আমাকে স্ট্যাম্পের সামনে ব্যাট নিয়ে দাঁড়াতে বললো। ওর এই কথাটিকে আমি আক্ষরিক অর্থেই নিলাম। ব্যাট আর তুলি না, এমনকি লোপ্পা বল দিলেও ঠায় দাঁড়ায়ে থাকি। অস্ট্রেলিয়া তখনো স্লেজিংটাকে জনপ্রিয় না করলেও উইকেটের পিছন থেকে উইকেটকিপারের আর আশেপাশের ফিল্ডারদের মুখ নিসৃত মধুময় বানীও যখন আমাকে আমার লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারলো না, নিরাজনও সন্দেহের বশবর্তী হয়ে একবার আমার কাছে এসে জানতে চাইলো আমার কানে কোনো সমস্যা আছে কি না বা কানে তুলা দিয়ে মাঠে নেমেছি কি না। জবাবে সে শুধু আমার বত্রিশটা দাঁতই দেখতে পেয়েছিলো। পনের ওভারে নয় উইকেটে চুয়াত্তর থেকে শুরু করে আমরা যখন মাঠ থেকে বেরিয়ে আসলাম তখন দলের রান নয় উইকেটে একশত চব্বিশ। আমার নামের পাশে রান সংখ্যা শূন্য আর বলের সংখ্যা বত্রিশ! খেলাতে আমরা হেরে গিয়েছিলাম, তারপরও খেলা শেষে আমার প্রশংসায় আমার ব্যাচ পঞ্চমুখ ছিলো। কিন্তু আমাদের সবার চোখ আটকে গেলো অন্য জায়গায়। মাঠের পাশে প্যান্ডেলের নিচে দেখতে পেলাম কয়েকটা পরীর বোবা চাহনি, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠা। জলি, পুজা, স্নিগ্ধাসহ আমাদের ব্যাচের মেয়েদের কান্না দেখে নিজেদের চোখও যে কখন আদ্র হয়ে উঠলো বুঝতেই পারলাম না।
ক্রিকেট প্রতিযোগিতার আগেই আমি ফয়েজের সাথে কিঞ্চিত মনোমালিন্যের জন্য রুম পরিবর্তন করে ফেলেছিলাম। আমি যে রুমে গেলাম সেখানকার তিন রুমমেটই আমার সিনিয়র, জে-৬ ব্যাচের। মামুন ভাইয়া ছিলেন শান্ত স্বভাবের, একটু আবেগী এবং আবেগটা সহজেই প্রকাশ পেতো। উনি পড়াশোনা করতেন জোরে জোরে উচ্চারন করে, আমি এজন্য উনাকে খুব খেপাতাম। মামুন ভাইয়া যখন ছুটিতে উনার বাড়ি চট্টগ্রামে যেতেন, আমরা জানতাম, আসার সময় কিছু না কিছু নিয়ে আসবেন। সোহাগ ভাইয়ার আবার সাতক্ষী্রায় একটা সিনেমা হল ছিলো। উনার কাছ থেকে আমরা প্রায়ই সিনেমা হলের রমরমা কাহিনী শুনতাম। সোহাগ ভাইয়াও আবেগী ছিলেন, কিন্তু উনি সেটা বুঝতে দিতেন না। আর পারভেজ ভাইয়ার সাথে আমার মিল ছিলো দুই জায়গায়। উনার বাড়ি নোয়াখালী, আমার বাড়িও নোয়াখালী; উনি ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলেন, আমিও ঢাকা কলেজের ছাত্র ছিলাম। আর অমিলটা ছিলো আমি তখনও ব্যাচেলর আর উনি আমাদের ব্যাচেরই দুলাভাই হয়ে গেলেন! না, না, বিয়ে হয়নি, আমাদের ব্যাচের লাকীর সাথে মন দেওয়া নেওয়া শুরু করেছেন মাত্র!
এই রকম অবস্থার মধ্যেই এক সময় আবিষ্কার করলাম মজার দিনগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে। সামনে প্রথম প্রফেশনাল পরীক্ষা চলে এসেছে। আমাদের ব্যাচের আমরা সবাই আস্তে আস্তে মেডিকেলের খটমটে বইয়ের রাজ্যে হারিয়ে যেতে লাগলাম। এর মধ্যেও কোনো একটু অবসরে যখন আনমনা হয়ে যেতাম, চোখের সামনে ভেসে উঠতো সদ্য প্রকাশিত কলেজ ম্যাগাজিনে চঞ্চলা, চপলা হরিনীর লেখা কবিতাটি-
‘তুমি রোদেলা দুপুরে সূর্য,
তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা।
তুমি কুয়াশায় ঢাকা চারিধার,
তুমি ঝিঁ ঝিঁ ডাকা এক রাত্রি।
তুমি নিঝুম রাতের স্বপ্ন,
তুমি প্রেমিক মনের জ্যোৎস্না।
তুমি কিশোরীর চাপা কষ্ট,
শুধু বয়ে চলা এক ঝর্ণা
তুমি প্রেমিকার নীল চিঠি,
তুমি কফি হাউজের আড্ডা।
তুমি সুখ, দুঃখ, কষ্ট,
তুমি বুকে জমে থাকা কান্না।
তুমি এলোমেলো পথ চলা,
শুধু ভালোলাগা, ভালোবাসা।’ –
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমি আবার বইয়ের দিকে চোখ ফেরাতাম!
