আর্কিও-কগনিশন ইউনিট 09

যখন পৃথিবী আর “পৃথিবী” ছিল না—শুধু ধ্বংসস্তূপের ওপর ভাসমান কিছু স্যাটেলাইট আর বিকৃত মেমরি-ক্যাপসুল, তখন অ্যান্টার্কটিকায় গড়ে উঠেছিল ‘আর্কিও-কগনিশন ইউনিট 09’।
এই ইউনিট একদিন খুঁজে পায় এক বিস্ময়কর জায়গা—পুরোনো জঙ্গলবাড়ির ধ্বংসাবশেষ। সেখানে এক ছায়াময় ভাষায় খোদাই ছিল কিছু শব্দ, যেগুলো আধুনিক কেউ বোঝে না। শুধু শব্দগুলো বেঁচে ছিল –
“মনোবুক”, “লুলা”, “জাতহীন”, “মাদী”, “ঘোড়া”, “অভিনয়”, “স্বজাতভক্ষণ”…
মনোবুক ছিল একধরনের স্নায়ুবৃত্তিক প্রতিচ্ছবি—পশুদের অভ্যন্তরীণ চেতনার প্রতিধ্বনি, যাকে তারা “সত্য” বলে মেনে নিত।
এই প্ল্যাটফর্মে ‘গর্জন’ শব্দটা ছিল একক মুদ্রা—যার যত বেশি গর্জন, সে তত বেশি শ্রদ্ধার পাত্র।
এখানে যুক্তি নয়, “উল্লাস” ছিল সত্যের পরিমাপক। “প্রশংসা করো, নইলে হারাও”—এটাই ছিল মনোবুকের মূলনীতি।
জঙ্গলবাড়ির শাসক ছিল এক ‘অর্ধবিকল’ চতুষ্পদ—লুলা, কিন্তু মুখে ছিল প্রবল গর্জন। তার প্রিয় কথাসাহিত্যিক ছিল এক লোমশ বেজি, যে প্রতিদিন বিকেলে নতুন উপাখ্যান রচনা করত:
“প্রভু একা। প্রভু চিরন্তন। প্রভুর কোনো বিকল্প হয় না।”
শিয়ালরা তখন আইন বানাত, আবার ভাঙত, আবার ‘বিনোদনের স্বার্থে’ পুনর্লিখন করত।
কুকুর? সে তো হাড় না পেলে কামড়াত। কাকে কামড়াবে, সেটা ঠিক করত মনোবুকের জনপ্রিয়তাসূচক গড়পড়তা গ্রাফ।
বহু শতাব্দী আগের এক ঝাপসা মেমোরি ফ্র্যাগমেন্টে দেখা যায় এক মাদী ঘোড়া—সাবলীল, দৃঢ়কণ্ঠ।
সে কিছু সময়ের জন্য পশুদের রক্ষা করেছিল।
শৃঙ্খলা ফিরিয়েছিল।
তবে সে বড় বেশি কথা বলত।
মনোবুকে তার গলা ভারি ঠেকত।
তাই একদিন হঠাৎ তার ঘোড়ার খুরে জড়িয়ে দেওয়া হয় “বিদ্রোহ” শব্দটি, আর মেমোরিতে তার নামের জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হয় একটি চিহ্ন—☓
এই সমাজের পশুগুলো আগে যে কোথা থেকে এসেছিল, তা জানার জন্য মস্তিষ্ক-বিন্যাস বিশ্লেষণ চালানো হয়।
ফলাফল চমকপ্রদ: এরা কেউই জন্মসূত্রে স্বাধীন ছিল না।
তারা এসেছিল এক সার্কাস থেকে—
যেখানে চাবুকের শব্দে তারা গান গাইত, আর হাততালিতে নাচত।
এখন শুধু সেই সার্কাসটাই হয়ে গেছে রাষ্ট্র।
চাবুক নেই, কিন্তু শব্দ আছে।
তালি নেই, তবে গর্জন আছে।
আর মনোবুক—সেই চিরন্তন রিংমাস্টার।
জঙ্গলবাড়ি এক সময় নিজস্ব খাদ্যে সমৃদ্ধ ছিল।
কিন্তু ‘উন্নয়ন’ নামে এক ধরনের ঝলমলে ফাঁপা চেতনাপুষ্ট পদার্থ তাদের সমস্ত শস্য জমি গিলে ফেলেছিল।
খাবার না পেয়ে পশুরা শুরু করল পরস্পরকে কামড়ানো।
বেজি খায় শিয়াল, শিয়াল খায় হায়েনা, হায়েনা খায় কুকুর, আর কুকুর খেয়ে ফেলে সেই পুরোনো মাদী ঘোড়ার একটি অবশিষ্ট চুল, যেটা সে তখনো মুখে ঝুলিয়ে রেখেছিল ‘বিশ্বাস’ বলে।
অবশেষে, লুলা বাঘ আয়নায় নিজেকে দেখে বলে:
“আমার মধ্যে কেউ নেই… কেবল আমার ছায়া। আর সেটা এখন আমার দাঁতেও ভয় পায়।”
“এরা কোথায় গেল?”—এই প্রশ্নের জবাব মেলেনি।
তবে আর্কিও-কগনিশন ইউনিট 09-এর গবেষকরা লিখেছে:
“মনোবুক একটি সভ্যতাকে গড়ে তুলেছিল—আবেগ আর আওয়াজে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা নিজেদের খেয়ে ফেলেছিল।
কারণ সত্য বলার কেউ বেঁচে ছিল না।
আর যাদের দাঁত ছিল, তাদের ক্ষুধা ফুরোয়নি।”
একদিন কেউ এক ঝাপসা হ্যালোগ্রাফিক ফুটেজ চালায়।
দেখা যায়—একটা পাতা নড়ছে।
তার ওপরে লেখা—
“এখনও সময় আছে। তবে বলতে হবে মনোবুকের বাইরে গিয়ে।”
---
ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
এই গল্পের সাথে বাস্তবের কোনো কিছুর মিল খুঁজে পাওয়া স্বপ্ন দেখার নামান্তর।
 
 

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!