আল্লাহ বেশ রেখেছে

আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ। এমন সাধারণ, যার শরীরে এখনো মফস্বলের সেই চেনা কেঁজো গন্ধ লেগে আছে। সেই গন্ধে আছে বাসস্ট্যান্ডের ধুলো, দুপুরবেলার অলস রোদ, ছোট শহরের চায়ের দোকানে বসে থাকা মানুষের ধৈর্য। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার—এই মফস্বলও যেন আমার শিকড় নয়।
 
গ্রামে একটা বাড়ি ছিল, কিংবা আছে—ঠিক করে বলতে পারি না। কিন্তু সেই বাড়ির উঠোনে আমার বড় হয়ে ওঠা হয়নি। গ্রামের মানুষের মতো জমির গল্প, ধানের গল্প, মৌসুমের গল্প—এসব আমার অভিজ্ঞতার ভেতর ঢোকেনি। গ্রামের পথ আমার চেনা, কিন্তু গ্রামের জীবন কখনো আমার নিজের হয়ে ওঠেনি।
 
ঢাকাও আমার শহর নয়। জীবনের প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছরের মধ্যে হয়তো ষোল-সতেরো বছর ঢাকায় কাটিয়েছি। কিন্তু ঢাকাকে কখনো আপন মনে হয়নি। শহরটা আমার কাছে সবসময় একটু অচেনা থেকেছে—কোলাহলময়, দ্রুত, কখনো কখনো নিষ্ঠুর। সেখানে মানুষ খুব কাছে থাকে, অথচ কেউ কারো নয়।
 
এইভাবে ভাবতে বসলে মনে হয়, আমি যেন কোথাও পুরোপুরি belong করি না। মফস্বল ভালো লাগে, কিন্তু সেখানে আমার শিকড় নেই। গ্রাম আছে, কিন্তু আমি গ্রামের মানুষ নই। ঢাকা আছে, কিন্তু ঢাকা আমাকে গ্রহণ করেনি। তাই কখনো কখনো মনে হয়, আমি যেন ঝড়ে উড়ে যাবার জন্য অপেক্ষা করে থাকা একটা মানুষ—যার মাটিতে খুব গভীর কোনো পেরেক গাঁথা নেই।
সম্ভবত এই কারণেই নিজের ভেতরে মাঝে মাঝে একটা বোহেমিয়ান সত্তা টের পাই। যেন কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানার মানুষ নই আমি।
 
তবু আজকের লেখার বিষয় সেটা না।
 
আমি এখন মধ্যবয়সী একজন মানুষ। জীবনের দিকে তাকালে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। একসময় যশের খুব ইচ্ছে ছিল। মানুষের মতো মানুষ হব, কিছু একটা করব—এমন স্বপ্ন ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্নের দিকে দৌড়ানোর শক্তি কখন যেন কমে গেছে। আজ যদি কেউ জিজ্ঞেস করে—আমি যা হয়েছি, কীভাবে হয়েছি—আমি নিজেও খুব পরিষ্কার করে বলতে পারব না।
অথচ চারপাশে কত মানুষ কত কিছু করছে। কেউ বিপ্লব করে ফেলছে। কেউ হয়ে যাচ্ছে দেশের বড় নেতা। কেউ খুব অল্প বয়সে সেরা উদ্যোক্তা, বিলিয়ন ডলার আয় করছে। কেউ কারো বিয়েতে কোটি টাকার আয়োজন করছে। আবার কেউ অস্কার পাচ্ছে, কেউ নোবেল পাচ্ছে।
 
আমি সেসব কিছুই না।
একসময় মনে হতো, আমিও হয়তো তাদের মতো হব। এখন মনে হয়, সেই ইচ্ছেগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। খুব বেশি আফসোসও হয় না।
তবে একটা জিনিস আমি জানি—মানুষকে আমি কিছুটা বুঝি। হয়তো খুব গভীরভাবে না, কিন্তু মানুষের ভেতরের ছোট ছোট টানাপোড়েনগুলো আমার চোখ এড়িয়ে যায় না। এই বিষয়টা আমার ভালো লাগে।
আমি এমন একটা প্রজন্মের মানুষ, যারা দুই পৃথিবীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের শৈশব ছিল পুরোপুরি এনালগ—চিঠি, টেপ রেকর্ডার, ক্যাসেট, হাতে লেখা ডায়েরি। তারপর হঠাৎ পৃথিবী ডিজিটাল হয়ে গেল। আমরা সেই পরিবর্তনটা চোখের সামনে দেখেছি।
 
তাই আমরা পুরোপুরি এনালগও না, আবার পুরোপুরি ডিজিটালও না। মাঝখানের এক অদ্ভুত সেতু।
কক্সবাজারে এসে জেনজি থেকে শুরু করে নানা বয়সের মানুষের সঙ্গে মিশেছি। কখনো মনে হয়েছে, বয়স আর অভিজ্ঞতার কারণে আমি এগিয়ে। আবার কখনো মনে হয়েছে, এদের সামনে দাঁড়ানোর মতো যোগ্যতাই কি আমার আছে?
 
মানুষের জীবন বোধহয় এমনই। কখনো নিজেকে বড় মনে হয়, কখনো খুব ছোট।
 
কিছুদিন আগে অদ্ভুত একটা চিন্তা মাথায় এসেছিল। মনে হচ্ছিল—যা হয়েছি, তাও যদি না হতাম! যদি একেবারে সাধারণ একজন মানুষ হয়ে জন্মাতাম! খুব সাধারণ, খুব নির্মল, খুব নিস্পাপ একটা জীবন।
এই ইচ্ছেটা হয়তো অনেকেরই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে আসে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে মনে হয়, এটা শুধু এক মুহূর্তের ভাবনা না। সত্যিই মাঝে মাঝে মনে হয়—একটা একেবারে সাধারণ জীবন যদি পেতাম!
এমন জীবন, যেখানে প্রতিযোগিতা নেই। তুলনা নেই। কারো সাথে নিজেকে মাপার দরকার নেই। এমন জীবন, যেখানে আমি খুব বেশি কিছু জানি না, খুব বেশি কিছু হতে চাই না।
শুধু একটা ছোট দিন কাটে। সকাল হয়, সন্ধ্যা নামে। মানুষজনের সাথে কিছু কথা হয়। হয়তো এক কাপ চা খাওয়া হয়। হয়তো কোনো কাজ শেষ করে ঘরে ফেরা হয়।
তারপর রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে মনে হয়—
আজকের দিনটা খারাপ ছিল না।
 
আর বুকের ভেতর থেকে খুব সহজ একটা কথা বেরিয়ে আসে—আল্লাহ বেশ রেখেছে।
 
 
 
 
 

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!