কারো কাছে পৃথিবীটা যেন খুব ধীরে ঘোরে। সময় হাঁটে, দম নেয়, মাঝেমধ্যে থেমে তাকায়। আর কারো কাছে—একবার চোখের পলক ফেলতেই দিন ফুরিয়ে যায়। একই আকাশ, একই আলো, একই শহর—তবু সময়ের গতি সবার জন্য এক নয়।
সেদিন একজনকে দেখে ভালো লেগেছিল। ভালো লাগার কথাটা সবসময় মুখে বলা যায় না। কখনো শুধু মনে একটা নরম রঙ লেগে থাকে—যার নাম নেই, ব্যাখ্যা নেই। বললেও ক্ষতি ছিল না, তবু না বলাই ঠিক মনে হয়েছিল। দেখা হওয়ার মুহূর্তে মনে মনে শুধু এইটুকুই চেয়েছিলাম—সময়টা যদি একটু ধীরে চলে। যেন মুহূর্তগুলো তাড়াহুড়ো করে পালিয়ে না যায়, যেন বসে থাকে আরও কিছুক্ষণ।
আমি কফি খুব পছন্দ করি। বিশেষ করে ল্যাটে। সেটাই আমার অভ্যাস। কিন্তু সেদিন ব্ল্যাক কফি নিয়েছিলাম, চিনি ছাড়া। কারণ অপ্রিয় জিনিস ধীরে ধীরে খাওয়া যায়। আর ধীরে খেলে সময়ও একটু বেশি লাগে। আমি চাইছিলাম, পৃথিবীটা সেদিন আমার জন্য একটু ধীরে ঘুরুক। কাপের ভেতরের কফির মতো সময়টাও যেন ঠান্ডা হতে সময় নেয়।
গল্প হচ্ছিল। আসলে সে বলছিল, আমি শুনছিলাম। চোখের দিকে তাকিয়ে। সাধারণত আমি কথা বলি অনেক বেশি—কখনো প্রয়োজন ছাড়াই। কিন্তু সেদিন চুপ করে ছিলাম। ভয় ছিল, আমি কথা বলতে শুরু করলে সময়টা দ্রুত ফুরিয়ে যাবে। আমি শুনে যেতে চেয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, শুনতে থাকলে মুহূর্তগুলো হয়তো একটু বেশি সময় ধরে থাকবে।
এবার অন্য কথা। গত কয়েকদিন ধরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি ভর করেছে আমাকে। আমি একা মানুষ। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে, অথচ বিয়ে করে থিতু হওয়া হয়নি। চারপাশের সবাই বলে,
“বেলা তো ফুরিয়ে আসছে। এবার বিয়েটা করে ফেলো।”
আমি কিছু বলি না। শুধু হাসি। বাইরে থেকে ওই হাসিটা হয়তো নিশ্চিন্তের। ভেতরে ভেতরে আমি নিজেকেই বলি, “এই বেশ ভালো আছি।”
কিন্তু এখন কথাটা আর আগের মতো সহজ লাগে না। মনে হয়—সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে সন্ধ্যায় ঘরে ঢোকার সময় কেউ যদি দরজাটা খুলে দেয়, তাতে ক্ষতি কী? রাতে বারান্দায় চা খেতে খেতে যদি হঠাৎ কারো হাত আমার হাত ছুঁয়ে যায়, সেটাও কি খুব অপ্রয়োজনীয়? কেউ কিছু না বলুক, শুধু পাশে থাকার অনুভূতিটাই যেন জীবনকে অসময়ে শেষ হয়ে যেতে দেয় না। যেন বলে—এখনো কিছু বাকি আছে।
আবার আগের জায়গায় ফিরি। আমি মুগ্ধ হয়ে কান্দাহারির কথা শুনছিলাম। হ্যাঁ, কান্দাহারি—ওটাই তার নাম। পূর্ব পুরুষের জন্ম কান্দাহারে। এখন বসতি এখানে। সে যখন কথা বলছিল, আমি আসলে কথাগুলো শুনছিলাম না। আমি দেখছিলাম তার মুখ, তার চোখ, তার নাক, তার কান। নাকের ওপর ছোট্ট একটা তিল। সবকিছু নিঃশব্দে মনে ভরে নিচ্ছিলাম। যেন পরে মনে পড়ে, যদি আর কখনো দেখা না হয়।
এমন সময় হঠাৎ সে বলল, "আজ উঠি। বাড়িতে আমার মানুষ অপেক্ষা করে আছে। আমার হাতের স্পর্শের জন্য।”
কথাটা খুব সাধারণ ছিল। কোনো নাটক ছিল না। কিন্তু আমার ভেতরে তখন কিছু একটা ভেঙে পড়ল। এতক্ষণ ধরে যে পৃথিবীটা আমি ধীরে ঘুরাতে চাইছিলাম, সেই মুহূর্তে আমি ঠিক উল্টোটা চাইলাম।
আমি চাইছিলাম—পৃথিবীটা আর ধীরে না ঘুরুক। বরং খুব দ্রুত। যত দ্রুত সম্ভব।