তুতানখামুন: নীরবতার অভিশাপ

"তুতানখামুন: নীরবতার অভিশাপ"
-----------------------------------
তুতানখামুন—নামটিই যেন আজকের দিনে এক জাদুবন্ধনের প্রতীক। অথচ ইতিহাসের সোজা ভাষায় বললে, তিনি ছিলেন না কোনো মহাবীর, না কোনো শাসনক্ষম মহানায়ক। তাঁর নামের পাশে নেই কোন বিশাল যুদ্ধজয়, নেই দীর্ঘ শাসনকাল, নেই কোনো স্থাপত্যের চিহ্ন যা অন্য রাজাদের মতো দাঁড়িয়ে আছে সহস্রাব্দ পেরিয়ে। তিনি ছিলেন কেবল এক বালক রাজা—নয় বছর বয়সে রাজসিংহাসনে বসেছিলেন, আর ঊনিশ বছর বয়সেই তাঁর মৃত্যু। তাও কি স্বাভাবিক মৃত্যু? নাকি হিসেব কষা এক পরিকল্পিত মুঠোয় আটকে গিয়েছিল তাঁর শ্বাস?
 
তাঁর পিতা—আখেনাতেন, ইতিহাসের বহুল আলোচিত এক রহস্যময় চরিত্র। বলা হয়, বিশ্ব ইতিহাসে সরকারিভাবে তিনিই প্রথম একেশ্বরবাদের ঘোষণা দেন। আতেন—সূর্যরশ্মির দেবতা—তাঁর রাজ্যপাটের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি একে একে বাতিল করেন শত শত দেবতা, বন্ধ করে দেন থিবসের পুরাতন মন্দির, পুরোহিতেরা হারায় প্রভাব, মুখ বুজে থাকেন দেবী আমুন, ওসিরিস, আনুবিস। আর এই বিপ্লবের তীব্র স্রোতের ঠিক মাঝখানে জন্ম নেয় তুতানখাতেন—পরবর্তীতে যার নাম হয় তুতানখামুন।
 
আখেনাতেন যখন মারা যান, তখন ছেলেটির বয়স মাত্র নয়। এক হাতে তামার রাজদণ্ড, আরেক হাতে সদ্য ফেলা শিশুমূলের কলম। তাঁকে বলা হলো, “তুমি এখন ফারাও।” কিন্তু আদতে কি ছিল তাঁর নিজের কোনো বলার অধিকার? শিশু শরীরে ছিল এক ছায়ার অস্তিত্ব—উজির আইয়ী, যিনি ফিসফিস করে দিক নির্দেশ করতেন; পাশে ছিলেন সেনাপতি হোরেমহেব, যাঁর চোখে ছিল শক্তির দাবানল।
 
তুতানখামুনের শাসনকালের দশ বছর—তা কেবল এক কিশোর রাজাকে দিয়ে তার পিতার বিরুদ্ধে ঘুরে বেড়ানো, মুখস্থ করা কিছু কথা বার বার বলানো: “আমার বাবা ভুল ছিলেন। আমার বাবা নষ্ট ছিলেন। আমার বাবা ভ্রষ্ট ছিলেন।”
 
ভাবা যায়? এক শিশুকে তার বাবার নামে মানুষের ভিড়ে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, আর বলা হয়—বলো। বলো, যাতে আতেনের নাম মুছে যায়, এবং পুরাতন দেবতারা ফিরে আসে।
 
এই ছেলেটি হয়তো প্রথম প্রথম বুঝতেই পারেনি কী বলছে, কেন বলছে। হয়তো একসময় তাঁর কণ্ঠ কেঁপে উঠেছে, হয়তো তাঁর চোখে ভেসে উঠেছে আখেনাতেনের হেসে ওঠা মুখ। সেই বাবা, যে তাঁকে পরম আদরে বড় করেছিলেন, যে তাঁকে ঝলমলে আমারনার প্রাসাদে রেখে বলেছিলেন, “তুমি আমার উত্তরসূরি”—সেই বাবার নামেই তাঁর ঠোঁট দিয়ে উচ্চারিত হতো অবজ্ঞা।
 
আর চারপাশের মানুষ করতেন করতালি, করতেন হুকুম পালন। তুতানখামুন শুধু তাকিয়ে থাকতেন তাদের দিকে—একজোড়া কিশোর চোখ, যার ভিতরে জন্ম নিত ধোঁয়াশা, ক্ষোভ, কিংবা হয়তো এক প্রকার নীরব আত্মদাহ।
ফারাও হয়েও তিনি ছিলেন বন্দি। তাঁর রাজত্ব, তাঁর ধর্ম, এমনকি তাঁর মুখের শব্দও ছিল অন্যের হাতে লেখা। একদা ছিলেন তুতানখাতেন, আতেনের নামধারী সন্তান; পরে নাম বদলে হলেন তুতানখামুন, আমুন দেবতার পূজক। কিন্তু এই বদল কি ছিল সত্যিকার মন থেকে? না কি ছিল কেবল এক চাপা আজ্ঞাবহতা?
 
তাঁর হৃদয়ের গহীনে হয়তো প্রতিদিনই উচ্চারিত হতো এক নীরব বেদনা—“বাবা, আমি তো তোমারই ছেলে। কেন আমাকে দিয়ে তোমার নাম মুছিয়ে দিচ্ছে ওরা?” আর কোথাও না কোথাও, হয়তো তাঁর মনে জন্ম নিয়েছিল সেই অব্যক্ত প্রতিরোধ, যার চিহ্ন নেই রাজকীয় ডিক্রিতে, কিন্তু আছে ইতিহাসের অলিখিত প্রান্তে—এক বালক রাজার বিষণ্ন নীরবতায়।
 
তাঁর মুখে কেউ হাসি আঁকেনি, চোখে কেউ খুশির আভা রাখেনি। এই রাজা সেই সময়ের প্রতিনিধি, যেখানে রাজতন্ত্রের পোশাকে ঢেকে রাখা হয়েছিল এক কিশোরের ব্যক্তিগত কান্না। আর ঠিক সেই কারণেই, আজও তুতানখামুন আমাদের কাছে এত জনপ্রিয়—কারণ তিনি ছিলেন ভাঙনের ভিতরে নির্মাণ করা এক শিশু-রাজা, যাঁর জীবন ছিল ঘিরে থাকা নিঃশব্দ বাধ্যতা, আর যাঁর মৃত্যুও রহস্যের গহ্বরে হারিয়ে গেছে।
তিনি অমর হয়েছেন, কারণ তিনি হেরে গিয়েছিলেন জীবনের কাছে। আর ইতিহাস—সে সবসময় পরাজিতদের ভালোবাসে।
 
তাঁর সমাধি আবিষ্কারের গল্পটি যেন কোনো সাসপেন্স-ভরা থ্রিলার। ১৯২২ সালের এক নভেম্বরের দিন, রাজাদের উপত্যকার গরম ধুলোমাখা মাটির নিচে ইতিহাস অপেক্ষা করছিল জেগে ওঠার জন্য। বহু বছরের চেষ্টার পর হাওয়ার্ড কার্টার যখন সেই সিঁড়ির প্রথম ধাপ আবিষ্কার করলেন, তখন তাঁর শরীরের প্রতিটি স্নায়ু যেন কেঁপে উঠেছিল। গাঁথা ছিল এক অক্ষত দেয়াল, যার ওপারে সময় জমে ছিল হাজার বছর ধরে। লর্ড কার্নারভন উত্তেজনায় জিজ্ঞেস করলেন—"কি দেখছ, কার্টার?" আর কার্টার বলেছিলেন সেই বিখ্যাত শব্দগুচ্ছ—"অবিশ্বাস্য, অপূর্ব, অকল্পনীয়। সর্বত্র সোনার ঝলকানি!"
 
সমাধির দরজা খুলে দেখা গেল—একটি পরিপাটি ঘর, যেন মৃত্যুর জন্য নয়, কোনো রাজকীয় অনুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। আসবাবপত্র, ঘোড়ার রথ, সিংহাসন, ছোটবেলার খেলনা, এমনকি সেই শয্যা যেখানে শোয়ানো হয়েছিল ফারাওকে তাঁর শেষ যাত্রার আগে—সব ছিল সেখানে। একটি ঘরে ছিল চারটি উপাসনালয়, একটির ভিতরে আরেকটি, আর সর্বশেষে চতুর্থ উপাসনালয়ের গর্ভে ছিল সোনায় মোড়ানো সারকোফাগাস। তার ভিতরে আবার একটি কফিন, তার ভিতরে আরেকটি। যেন মৃত্যুকেও পর্দার পর সবচেয়ে অবাক করা বিষয় ছিল, সারকোফাগাসের গভীরে এক অনবদ্য নিঃশব্দ উপস্থিতি—তুতানখামুনের নিজস্ব মমি, তাঁর আত্মার নীরব প্রহরী হয়ে। তাঁর মুখাবয়বের সোনালি মুখোশ, চোখের স্থির দৃষ্টি, যেন হাজার বছর পরও ইতিহাসকে প্রশ্ন করে—"তোমরা কি আমাকে বুঝেছো?"
 
এই সমাধির ভিতরে যা ছিল, তা একেকটি কবিতা, একেকটি নিরব ইতিহাসের স্তবক। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে, সেখানে কোনো প্যাপিরাস ছিল না, কোনো ঐতিহাসিক লিপি যা তুতানখামুনের রাজত্বের গল্প বলে। সমাধিতে ছিল না কোনো রাজমুকুট, অথচ ছিল শিশু সিংহাসন, ছিল রাজকীয় স্যান্ডাল। ইতিহাস যেন উদ্দেশ্য করেই কিছু অংশ গোপন রেখেছিল।
 
তাঁর আবিষ্কারের পর, কার্টার নিজেই বলেছিলেন—"তুতানখামুন আমাদের হাত ফসকে গেছেন।" কারণ, এত ধনসম্পদের মাঝে থেকেও রাজা যেন তাঁর আত্মপরিচয়কে রেখে গেছেন এক জটিল ধাঁধার আড়ালে।
তবুও, আমাদের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন সবচেয়ে জনপ্রিয় ফারাও। হয়তো এই কারণেই—কারণ তিনি রহস্যের রাজারাজড়া।
 
রহস্যটা কেবল মমির কক্ষেই আটকে ছিল না, তার ছায়া যেন সমগ্র পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছিল নিঃশব্দে, ধোঁয়াটে ধূসরতায়। সমাধি আবিষ্কারের প্রথম ক’দিনেই ঘটতে লাগল কিছু অস্বাভাবিক, ব্যাখ্যাতীত ঘটনা, যেগুলো হয়তো শুধুই কাকতাল, কিংবা হয়তো প্রাচীন কোনো অশরীরী সতর্কবার্তা।
 
খুবই সাধারণ এক সকালে, হাওয়ার্ড কার্টারের পোষা ক্যানারি পাখিটি হঠাৎ করে কোবরা সাপের কামড়ে মারা গেল। সাপটা ছিল ঘরের ভেতরেই, আর কার্টারের সহচররা বললেন—এটা আর যাই হোক, নিছক দুর্ঘটনা নয়। কোবরা তো কেবল ফারাওয়ের রাজমুকুটেই স্থান পায়! এই পাখিটিই ছিল সেই ‘Golden Bird’, যার ডাক, যার উপস্থিতি শ্রমিকদের বিশ্বাসে পথ দেখিয়েছিল রাজাদের উপত্যকায় কাঙ্ক্ষিত সমাধির দিকে। এই পাখির মৃত্যুকে তাই অনেকেই দেখলেন প্রতিশোধ হিসেবে—তুতানখামুনের আত্মা হয়তো জানিয়ে দিচ্ছিল, তার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটানো ঠিক হয়নি।
 
তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছিল - যাঁর নাম ইতিহাসে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে তুতানখামুনের সমাধি আবিষ্কারের সাথে—লর্ড কার্নারভনের ব্যাপারটি। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে, কায়রোয় এক অদ্ভুত জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় তাঁর। ডাক্তাররা বললেন, ‘লোবার নিউমোনিয়া, সঙ্গে প্লুরিসি’। আবার কেউ বললেন, ‘একটা মশার কামড় বিষ ছড়িয়ে দিয়েছিল তাঁর শরীর জুড়ে।’ কিন্তু রাজাদের উপত্যকার রুক্ষ, শুষ্ক আবহাওয়ায় মশা আসে কোথা থেকে? এ প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারেনি। এমনকি শহরে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যাওয়া, আর ইংল্যান্ডে তাঁর প্রিয় কুকুর সুজির অস্বাভাবিক মৃত্যু—সব মিলিয়ে পুরো ঘটনাকে ঘিরে গুজব আর ছায়া ঘনীভূত হতে থাকে।
 
এরপর থেকে যেন মৃত্যু হয়ে উঠল এক নীরব ফেরিওয়ালা, সমাধিতে পা রাখা মানুষদের বাড়িতে বাড়িতে খবর দিতে লাগল। কখনও বিষক্রিয়ায়, কখনও আগ্নেয়াস্ত্রে, আবার কখনও আত্মহত্যার ছদ্মবেশে মৃত্যু এসে দাঁড়াল সেই সকল মানুষদের দরজায়, যারা কোনোভাবে তুতানখামুনের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটিয়েছিলেন। আমেরিকান ধনকুবের জর্জ গোল্ড, যুবরাজ আলী কামেল ফাহমি, এক্স-রে বিশেষজ্ঞ স্যার ডগলাস, খননকারী আর্থার মেস, বা সেক্রেটারি রিচার্ড বেথেল—কেউ বাদ গেলেন না।
 
তবে এই অভিশাপ কি সত্যিই ছিল? নাকি কেবলই গল্পের মালা? অনেকেই বলেন, অভিশাপের ধারণা প্রথম ছড়িয়েছিল ১৮২০ সালের দিকে, যখন ইংল্যান্ডে শুরু হয় ‘মমি আনর্যাপিং পার্টি’। আলো-আঁধারির ভেতর মমির গায়ে পেঁচানো কাপড় খোলা হত, আর দর্শকরা বিস্ময়ে চেয়ে থাকতেন। লেখিকা লুইজা এলকট সেই সময়ে লিখেছিলেন ‘Lost in a Pyramid’, যেখানে এক পিরামিডে হারিয়ে যাওয়া দম্পতির মৃত্যুর পেছনে ছিল মিশরীয় যুবরাজের আত্মা।
 
তবে তুতানখামুনের ক্ষেত্রে অভিশাপের আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছিল সংবাদপত্র। সমাধির চাঞ্চল্যকর আবিষ্কার নিয়ে ‘টাইমস’-এর সাথে একচেটিয়া চুক্তির কারণে অন্য পত্রিকাগুলো তথ্য না পেয়ে কল্পনার আশ্রয় নিল। এদের মধ্যে প্রথম অভিশাপের গল্প বলেছিলেন লেখিকা মেরি কোরেলি। তিনি এক প্রাচীন আরবি পুঁথির কথা বললেন, যেখানে লেখা ছিল, ‘যে ফারাওয়ের ঘুম ভাঙাবে, তাকে শাস্তি পেতেই হবে।’ এমন এক ভৌতিক আতঙ্কের ভেতর দিয়ে পৃথিবী জানতে শুরু করল—তুতানখামুন মানে শুধু সোনা-মণি-মুক্তো নয়, তুতানখামুন মানে এক ছায়া, এক দৃষ্টি, এক অদৃশ্য সতর্কবার্তা।
 
স্যার আর্থার কোনান ডয়েল পর্যন্ত বললেন, ‘এটা তুতানখামুনের প্রতিশোধ!’ এমনকি ইতালির ফ্যাসিস্ট নেতা মুসোলিনিও ফিরিয়ে দিলেন উপহার পাওয়া এক মমি। ১৯৭০-এর দশকে যখন লন্ডনে তুতানখামুনের ধনরত্ন প্রদর্শিত হলো, তখন অভিশাপের কথা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠল। সাংবাদিকরা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিলেন প্রত্নতত্ত্ববিদ ডঃ গামাল মেহরেজকে। তিনি অভিশাপকে হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু পরদিন সকালে তাঁর নিথর দেহ পাওয়া গেল বিছানায়!
 
তবুও হাওয়ার্ড কার্টার ছিলেন ব্যতিক্রম। অভিশাপে তাঁর বিশ্বাস ছিল না। নির্ভয়ে, নিঃশব্দে, নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে গিয়েছিলেন তিনি। সমাধি উন্মোচনের দশ বছর পর, ১৯৩২ সালে তিনি কাজ শেষ করেন এবং চলে যান ইংল্যান্ডে। সাত বছর পর, ১৯৩৯ সালে, চুপচাপ বিদায় নেন পৃথিবী থেকে—লিম্ফোমায় আক্রান্ত হয়ে, ৬৪ বছর বয়সে। তাঁর মৃত্যুতেও কোনো অদ্ভুত ঘটনা ঘটেনি। কিংবা... হয়তো ঘটেছিল, কিন্তু আমরা তা জানি না।
তবে আজও, যখন কেউ তুতানখামুনের নাম উচ্চারণ করে, তার গলা যেন একটু কেঁপে ওঠে। হয়তো ভয়ের জন্য না, হয়তো শ্রদ্ধার জন্য। অথবা হয়তো এই কারণে যে, হাজার বছর পরে এসেও আমরা এখনও জানি না—তাঁকে সত্যিই ঘুম ভাঙাতে চেয়েছিল কে? কিন্তু তাঁকে ঘুম পাড়িয়েছিল কে, কিংবা কারা?
 
এই মমি অভিশাপের চেয়ে বড় নাটক রচিত হয়েছিল তুতানখামুনের মৃত্যুর পরে, যখন কায়রোর সূর্যতপ্ত বালির নিচে তাঁর সমাধি আবিষ্কারের পর একে একে উন্মোচিত হতে থাকে রহস্যের পর রহস্য। কার্টার সমাধি আবিষ্কারের পর যে দৃশ্য দেখতে পান, তা চমকে দেয় সবাইকে। মমিটি সম্মানের সঙ্গে রক্ষিত ছিল না, বরং পুড়ে যাওয়া কাপড়, তেলে আটকে থাকা দেহ এবং বিচ্ছিন্ন ভঙ্গিমায় শায়িত মৃতদেহ দেখে মনে হয়েছিল—এ যেন শেষযাত্রার নয়, বরং এক চরম অবমাননার প্রহসন।
 
প্রত্নতত্ত্ববিদেরা হতচকিত হন। জাদুটোনা আর ধর্মীয় আচার পালনের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত এক ধরণের ঘন তেল তুতানখামুনের মৃতদেহের গায়ে ঢালা হয়েছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সেই তেলই দেহটিকে কাঠিন্য আর পচন দুয়ের মাঝখানে আটকে রেখে এক বিশ্রী পরিণতি ঘটায়। কফিনে আটকে যাওয়া সেই দেহ টেনে বের করতে গিয়ে কার্টারের দল সূর্যের আলোয় কফিন গরম করেন, কাজ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মমির অঙ্গ ভেঙে ভেঙে তোলা হয়—একটি নিষ্ঠুর, কিন্তু সে সময়ের দৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এসব খবর নৃশংস বলেই মনে হয়, কিন্তু তখন ডিএনএ বিশ্লেষণের যুগ আসেনি, ছিল না জিনগত কোনো চেতনা। মমির মূল্য তখনো শুধু ইতিহাসের বাহ্যিক কাঠামোতে সীমাবদ্ধ ছিল।
 
তবু, সেই ছিন্নভিন্ন দেহ থেকেও বিজ্ঞানীরা তুলে আনেন চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। মোলার দাঁতের গঠন, হাড়ের গঠন ও এপিফিস দেখে নিশ্চিত হওয়া যায়—তুতানখামুনের বয়স ছিল আঠারো কিংবা ঊনিশ, যখন তাঁর জীবন থেমে যায়। তাঁর মমির পাশে পাওয়া যায় দুটি ছোট মমি—ভ্রূণ অবস্থায় মৃত শিশু কন্যা, সম্ভবত তাঁর স্ত্রী আঙ্খেসেনামেনের গর্ভজাত, জন্মের আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়া এক অপ্রকাশিত উত্তরাধিকার।
 
তাঁর মমির এক্স-রে স্ক্যান আরও উস্কে দেয় রহস্য। খুলির ভিতর জমাট বাঁধা রেজিন আর খুলির পেছনে রক্তক্ষরণের চিহ্ন দেখে শারীরবিদ ডা. আর.জি. হ্যারিসনের মনে হয়—তাঁর মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না। আঘাত ছিল, হয়তো খুন। যদিও নিশ্চিত প্রমাণ না থাকায় এই রহস্য আজো ধোঁয়াটে। তবে তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী আঙ্খেসেনামেন যেভাবে হিট্টি রাজাকে চিঠি লিখে সাহায্য চেয়েছিলেন—তাতে বোঝা যায়, রাজকীয় প্রাসাদের দেয়ালে তখন ষড়যন্ত্রের আঁচড় লেগেছিল। ফারাও মরেছেন, রানি ভীত, হিট্টি রাজকুমার আঙ্খেসেনামেনকে বিয়ের জন্য আসছেন, আর ঠিক সেই সময়েই সীমান্তে তাঁকে হত্যা করা হলো।
 
এই হত্যার নির্দেশ দিল কে? কেন তুতানখামুনের সমাধি এত ছোট? কেন এত তড়িঘড়ি করে মমি করা হলো? প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না। শুধু একটার পর একটা রহস্য এসে বসে—মরুভূমির বালির মত স্তরে স্তরে।
তুতানখামুন এখনো শায়িত রয়েছেন রাজাদের উপত্যকার তাঁর ক্ষুদ্র সমাধিতে। তিনিই একমাত্র ফারাও যাঁর মমি এখনো সেই আবিষ্কৃত কক্ষে রয়ে গেছে। কারণ, অনেক অভিশাপের গল্পের ভিড়ে, অনেক মৃত্যুর গুজবের ভেতরেও—তাঁর মমির স্পর্শ যেন আজও ইতিহাসের গায়ে শিহরণ তুলে দেয়।
 
চিত্র: তুতানখামুনের মমি
এই লেখাটি প্রকাশিতব্য গ্রন্থ "মিথেরা যেখানে শ্বাস নেয়" থেকে নেওয়া। এটা ড্রাফট থেকে নেওয়া হয়েছে।
 

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!