প্রথম পিরামিড দেখার অনুভূতি
---------------------------------
[অনেকদিন ধরেই Wahida Misha আমার কাছে জানতে চাচ্ছিলো বিশাল পিরামিড দেখে আমার অনুভূতি কী ছিল! পিরামিড তো অনেকেই দেখেছে। আমার অনুভূতি আলাদাভাবে জেনে কী হবে - এই কথা বলে প্রায় এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ওর কথা ছিল, আমি যেভাবে পিরামিড নিয়ে লিখেছি, যেভাবে ভেবেছি, সামনা সামনি দেখে সেইভাবেই কী অনুভব করেছিলাম? আমি নিরুত্তর ছিলাম। আজ Washi Tarafder এর জ্ঞানকোষের জন্য মিশরের ভ্রমণকাহিনির বইটি লেখার সময় একটা জায়গায় এসে এই অনুভূতির ব্যাপারটা আমি নিজেই লিখছিলাম। পরে মনে হলো, ফেসবুকে দেই - আর মিশাও শান্ত হোক। এই প্রশ্ন করে আর বিরক্ত করবে না।]
সকালের সোনালি আভা মিশরীয় মরুভূমির বুকে ছড়িয়ে পড়েছে। গিজার মালভূমির প্রবেশপথে দাঁড়িয়ে আমি অনুভব করছি এক অদ্ভুত ভার। আজ, এই মুহূর্তে, আমি পৃথিবীর প্রথম ও চিরন্তন আশ্চর্য—খুফুর গ্রেট পিরামিডের—সাক্ষাৎ পেতে চলেছি। এতদিন শুধু শব্দ আর ছবির জগতে বাস করেছি তার; কাগজের পাতায়, পর্দার পিক্সেলে, কল্পনার অলিন্দে। আজ সে রহস্যময়ী নিজের রূপে হাজির হবে আমার চোখের সামনে। অথচ, আশ্চর্য এই যে, আমার হৃদয়ে কোনো ঝড় বইছে না। কোনো উল্লাস নেই, কোনো শিহরণ নেই—শুধু এক গাঢ়, রহস্যময় শূন্যতা।
বিমান থেকে প্রথমবার সাক্কারা আর দাহশুরের পিরামিডগুলো দেখেছিলাম। জানালার ফাঁকে চেপে ধরে দেখেছিলাম সেই সুদূর পাথুরে পিরামিডগুলোকে। সেখানে উৎসুকতা ছিল, কিন্তু সেটা এক ধরনের 'চেনার' খেলা। "ওইটা জোসেরের ধাপ পিরামিড নিশ্চয়?" "ওই লাল পিরামিডটা স্নেফেরুর তো?"—মনে মনে পিরামিড শনাক্ত করার সেই তীব্র ইচ্ছাই ছিল মুখ্য। প্রকাণ্ড ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে আমি যেন এক কুইজ মাস্টার; সৌধের নাম মনে পড়ানোই ছিল লক্ষ্য। অনুভূতি? সেটা যেন গৌণ।
গিজার গেস্ট হাউজের ছাদে উঠে যখন প্রথমবার খুব কাছ থেকে পিরামিডগুলো দেখলাম, তখনো সেই বিস্ময়ের বন্যা এল না। দুপুরের প্রখর আলোয় ঝলমল করছিল খ্রেফেনের পিরামিডের শীর্ষভাগ। গ্রেট স্ফিংক্স দূরে রহস্যময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে। অথচ মনে হলো না, পৃথিবীর প্রাচীনতম আশ্চর্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। মনে হলো, পাশের বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছি। বিশাল, অবশ্যই—অকল্পনীয় রকমের বিশাল। কিন্তু সেই বিশালতা কি আমাকে চেপে ধরল? না। বরং এক অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া জন্মাল মনে: এই অপরিমেয় মহিমার সামনে আমি যেন এক ‘পুচকে’। তার স্থায়িত্ব, তার নিশ্চল অহংকারের সামনে আমার অস্তিত্ব যেন তুচ্ছ, ক্ষণস্থায়ী। এ কি ঈর্ষা? হিংসা? নাকি নিজের ক্ষুদ্রত্বের প্রতি এক তিক্ত উপলব্ধি? নিশ্চিত নই।
এখন, পিরামিড কমপ্লেক্সের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে, টিকিট হাতে নিয়ে ভাবছি: এখানে অনেক কিছু আছে। রহস্যে মোড়া সমাধিকক্ষ। প্রাচীন রাজপথ। কিন্তু সব জায়গায় যাওয়ার অনুমতি নেই। আমার পায়ের শক্তি, সময়ের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে আমিও হয়তো সব রহস্যের দ্বার উন্মোচন করতে পারব না। তবুও… তবুও এই মুহূর্তের জন্য অপেক্ষা করছিলাম কত দিন! এই বালুকাবতীর বুকে দাঁড়ানোর জন্য, এই পাথরের দৈত্যদের নিঃশব্দ গল্প শোনার জন্য।
পা বাড়াই সামনের দিকে। বালি এখনও রাতের শীতলতা ধরে রেখেছে, পায়ের তলায় ছড়িয়ে আছে হালকা ঠান্ডা। পর্যটকের ভিড় ধীরে ধীরে বাড়ছে। দূর থেকে পিরামিডগুলো এখনও ‘পাশের বাড়ি’র মতোই লাগে—কিন্তু যত কাছে যাচ্ছি, ততই তাদের প্রকৃত স্কেল ভয়াবহ রূপে ধরা দিচ্ছে। প্রতিটি পাথরের ব্লকই আমার উচ্চতার চেয়ে উঁচু। তাদের জ্যামিতিক নিখুঁত বিন্যাস, ঊর্ধ্বমুখী সেই অবিচল অভিযাত্রা—এ যেন পাথরে বাঁধা এক মহাজাগতিক উচ্চারণ। আমি হাঁটছি তাদের পাদদেশে, এক ক্ষুদ্র পিঁপড়ের মতো। আমার আগের হতাশা বা ঈর্ষা ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। তার জায়গায় আসছে এক গাঢ়, স্তব্ধ বিস্ময়। এই কি সেই অনুভূতি, যার জন্য এত দূর এসেছি?
গ্রেট পিরামিডের এক কোণায় দাঁড়াই। হাত রাখি সেই বিশাল চুনাপাথরের ব্লকে। হাজার হাজার বছর আগে কোন অজানা শিল্পীর ঘামে ভেজা হাত এই পাথর স্পর্শ করেছিল। কত প্রাণ, কত স্বপ্ন, কত বিশ্বাস জমাট বেঁধে আছে এই শীতল পাথরের গায়ে! সূর্য তার দীপ্তি ছড়িয়ে দিয়েছে, সকালের আলোয় চারপাশ ঝলমল করছে। পিরামিডের ছায়া দীর্ঘ হয়ে মরুভূমির বুকে ছড়িয়ে পড়েছে, যেন গিলে ফেলতে চায় সমগ্র প্রান্তর। সেই ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে আমি অনুভব করি—আমার সেই ‘অনুভূতিহীনতা’ আসলে ছিল ভয়। ভয় এই বিশালতার সামনে নিজেকে হারিয়ে ফেলার। ভয় ইতিহাসের এই অমোঘ সাক্ষীর সামনে অপ্রস্তুত হওয়ার।
আমি আরও একবার তাকাই সেই ঊর্ধ্বমুখী ত্রিভুজের দিকে, যে আকাশকে ছুঁতে চেয়েছিল। আজ আমি তার সামনে দাঁড়িয়েছি, হয়তো আমার প্রত্যাশিত সেই উচ্ছ্বাস নেই, নেই অঝোর ধারা। কিন্তু আছে এক গভীর, স্তব্ধ শ্রদ্ধা। এক অদ্ভুত শান্তি। এই পাথরের পর্বত শুধু প্রাচীন পৃথিবীর আশ্চর্য নয়; এ হল মানুষের অদম্য ইচ্ছার, অবিশ্বাস্য সাধনার, আর মহাকালের মুখোমুখি দাঁড়ানোর এক অনন্ত প্রতীক। আর আমি, এই মুহূর্তে, তার এক ক্ষুদ্র অংশ। এই উপলব্ধিই কি সেই অনুভূতি, যার সাথে আমার আগে কখনো পরিচয় হয়নি? হয়তো হ্যাঁ। পিরামিডের সামনে দাঁড়িয়ে আমি শুধু তাকে দেখিনি; আমি টের পেয়েছি নিজের ভেতরের এক নিস্তব্ধ, রহস্যময় গভীরতাকে।
