মেডিচি এবং মাকিয়াভেলি

মেডিচি এবং মাকিয়াভেলি

 
অনেকদিন ধরে নিজের বিষয়বস্তু মিথলজির বাইরে গিয়ে কিছু লিখতে ইচ্ছে করছিল। আজ লিখছি - মিথ নয়, কিন্তু মিথের চেয়েও মিথ - মেডিচি পরিবার এবং মাকিয়াভেলির কাহিনি। এটা নিয়ে আমার খুবই বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে আছে। কিন্তু আজ গল্পটা সারসংক্ষেপে বলি।
🕷️🕷️🕷️🕷️🕷️
এটা কোনো এক পরিবারের উত্থানের গল্প না—এটা টাকার হাতে রাজ্য কেনার গল্প, শিল্প দিয়ে পাপ ধোয়ার গল্প, আর রাজনীতির ভেতর দিয়ে ইতিহাসকে নিজের মতো করে লিখে নেওয়ার গল্প। এই গল্পে আছে ব্যাংক, খুন, পোপ, প্রেম, কবিতা, বিশ্বাসঘাতকতা—সব মিলিয়ে এক বিশাল রেনেসাঁ-নাট্যমঞ্চ।
১৪শ শতকের শেষ ভাগ। ইতালির ফ্লোরেন্স তখন কারখানা, বস্ত্র, সোনা আর ঋণের শহর। রাজা নেই, আছে ধনী পরিবার। শহর শাসন করে ব্যবসায়ীরা—তারাই প্রকৃত ক্ষমতাবান।
এই শহরের এক কোণায় ছিল মধ্যবিত্ত এক পরিবার—Medici পরিবার। নামের মানে চিকিৎসক, কিন্তু তারা ডাক্তার ছিল না। তারা ছিল টাকা-চিকিৎসক… ঋণ দিয়ে মানুষের ভাগ্য বদলে দেওয়ার কারিগর।
এই পরিবারের প্রথম বড় খেলোয়াড় ছিলেন Giovanni di Bicci de’ Medici। তিনি বুঝেছিলেন এক ভয়ংকর সত্য— তরবারিতে রাজ্য জয় হয়, কিন্তু সুদে রাজ্য কেনা যায়।
তিনি মেডিচি ব্যাংক গড়ে তুললেন। ইউরোপ জুড়ে শাখা—রোম, ভেনিস, লন্ডন, ব্রুজ। সবচেয়ে বড় ক্লায়েন্ট ছিল—ভ্যাটিকান।
পোপের টাকা মানে ঈশ্বরের টাকা। আর ঈশ্বরের টাকা মানে—অসীম নিরাপত্তা।
জিওভান্নির ছেলে Cosimo de’ Medici ছিল মেডিচি ইতিহাসের আসল স্থপতি।
ফ্লোরেন্সে তখন গণতন্ত্রের ভান—কাগজে সবাই সমান, বাস্তবে কয়েকটি পরিবার সব চালায়। কোসিমো সেই ব্যবস্থাটাকে নিজের পকেটে পুরে ফেলল।
সে যুদ্ধ করল না। সে আইন ভাঙল না। সে শুধু সবাইকে ধার দিল। কেউ টাকা ফেরত দিতে না পারলে? সে তাদের ভোট কিনত। তাদের বিচারক কিনত। তাদের শত্রুও কিনত।
একসময় শহরের কাউন্সিল, সেনাবাহিনী, আদালত—সব ঋণে ডুবে গেল একই মানুষের কাছে। কোসিমো নির্বাসনে গেল একবার, কিন্তু শহর চলল না। ছয় মাস পর চোখে জল নিয়ে ফ্লোরেন্স নিজেই তাকে ফিরিয়ে আনল।
সে ফিরেই বলল— “আমি সরকার হব না। সরকার আমাকে অনুসরণ করবে।”
কোসিমোর নাতি Lorenzo de’ Medici—এই নামটা রেনেসাঁর কিংবদন্তি। তার ঘরে বসে কাজ করেছে মাইকেল এঞ্জেলো, লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি। লোরেঞ্জো শিল্পকে টাকা দিল, শিল্প তাকে অমরতা দিল। কবিতা, ভাস্কর্য, দর্শন—সব ফুল ফুটল তার আঙিনায়।
কিন্তু এই ফুলের বাগান রক্তে ভেজা।
১৪৭৮ সালে Pazzi Conspiracy—গির্জার ভেতর তাকে খুন করার চেষ্টা হয়। তার ভাই জুলিয়ানো মারা যায় ছুরিকাঘাতে। লোরেঞ্জো বেঁচে যায়। এর পর যা হয়—ফ্লোরেন্স ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রতিশোধ।ষড়যন্ত্রকারীদের ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে জানালা থেকে ফেলা হয়।
সেদিন থেকে সবাই বুঝে যায়—মেডিচি মানে শুধু শিল্প নয়, নির্মম শক্তিও।
লোরেঞ্জোর মৃত্যুর পর তার ছেলে Piero de’ Medici ক্ষমতায় আসে। সে ছিল দুর্বল, অসংযত, রাজনৈতিকভাবে বোকা।
ফ্রান্স আক্রমণ করল। শহরে বিদ্রোহ হলো। মেডিচিদের তাড়িয়ে দেওয়া হলো।
এই সময় ফ্লোরেন্সে এক ধর্মপ্রচারক উঠে দাঁড়াল—Girolamo Savonarola। সে বলল—"এই শহর পাপে ভরে গেছে। আগুনে সব পুড়িয়ে শুদ্ধ করতে হবে।”
শিল্পকর্ম পোড়ানো হলো। বই পোড়ানো হলো। আয়না পোড়ানো হলো। মেডিচিদের স্বর্গ ভস্ম হলো।
তাদের একসময়কার ইশ্বরও তাদের বাঁচাতে পারলো না। ফ্লোরেন্স পরিণত হল প্রজাতন্ত্রে। আর এই প্রজাতন্ত্রের নাট্যমঞ্চে আবির্ভাব ঘটলো মাকিয়াভেলির।
ফ্লোরেন্সের রাজনীতির মঞ্চে মাকিয়াভেলি কোনো রাজপুত্র হয়ে আসেননি। তিনি এসেছিলেন দরজার ফাঁক দিয়ে—একজন নীরব কেরানি হিসেবে। আর সেখান থেকেই ধীরে ধীরে উঠে গেছেন ক্ষমতার ঠিক মাঝখানে। এই উত্থানটা ছিল বুদ্ধির, পর্যবেক্ষণের আর সময়কে ঠিকঠাক পড়তে পারার গল্প।
১৪৬৯ সাল। ফ্লোরেন্সে জন্ম নেয় এক সাধারণ পরিবারে এক ছেলে—Niccolò Machiavelli। তার পরিবার অভিজাত নয়, ক্ষমতাবান নয়। কিন্তু ঘরে ছিল বই। লাতিন ভাষা, রোমান ইতিহাস, সিসেরো, লিভি—এই সবই তার শৈশবের খেলনা।
তিনি খুব তাড়াতাড়ি বুঝে যান—এই শহরে টিকে থাকতে হলে বংশের চেয়ে বুদ্ধি বেশি দরকার। আর রাজনীতিতে ঢুকতে হলে দরবারের নয়, মানুষের মন পড়তে জানতে হয়।
১৪৯২ সালে Lorenzo de’ Medici মারা যান। তার কিছুদিন পরেই ফ্রান্স আক্রমণ করে ইতালি। ফ্লোরেন্সে বিদ্রোহ হয়, Medici পরিবার ক্ষমতাচ্যুত হয়। শহরে গড়ে ওঠে প্রজাতন্ত্র।
এই রাজনৈতিক ভূমিকম্পই মাকিয়াভেলির জীবনের দরজা খুলে দেয়। পুরনো অভিজাতরা পালায়। নতুন লোক দরকার হয় প্রশাসনে।
ঠিক তখনই, ১৪৯৮ সালে, মাত্র ২৯ বছর বয়সে মাকিয়াভেলি নিযুক্ত হন— ফ্লোরেন্স প্রজাতন্ত্রের দ্বিতীয় চ্যান্সারির সচিব হিসেবে। এটা কোনো আলঙ্কারিক পদ নয়। এই দপ্তরই চালাত পররাষ্ট্রনীতি, গুপ্তচরবৃত্তি, যুদ্ধ-পরিকল্পনা।
একদিনে মাকিয়াভেলি ঢুকে গেলেন ক্ষমতার রক্তপ্রবাহে।
এরপর শুরু হলো তার সত্যিকারের শিক্ষা। ফ্লোরেন্স তাকে পাঠাতে লাগল-
• ফ্রান্সের রাজদরবারে
• পোপের প্রাসাদে
• জার্মান সাম্রাজ্যে
• আর সবচেয়ে ভয়ংকর এক ব্যক্তির কাছে—সিজার বোর্গিয়া।
১৫০২ সাল। ফ্লোরেন্স প্রজাতন্ত্র মাকিয়াভেলিকে পাঠালো এক ভয়ংকর মিশনে—রোমান্যার শাসক সিজার বোর্গিয়ার দরবারে কূটনীতিক হিসেবে।
রোমান্যা তখন নরকের জমি। চারদিকে ছোট ছোট শহর-রাজ্য। প্রতিটা শহরের আলাদা ষড়যন্ত্র। আজ যে মিত্র, কাল সে খুনি। এই রোমান্যাকে এক ছাতার নিচে আনছেন সিজার বোর্গিয়া—পোপ ষষ্ঠ আলেকজান্ডারের অবৈধ, কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর পুত্র।
মাকিয়াভেলি যখন তার দরবারে পৌঁছালেন, তখন তিনি দেখলেন—এটা কোনো রাজদরবার না। এটা একটা জীবন্ত যুদ্ধঘর। সিজার ছিল একই সঙ্গে মোহনীয় আর আতঙ্কজনক। সে হাসত, কিন্তু সেই হাসির নিচে থাকত ফাঁসির দড়ির শব্দ।
মাকিয়াভেলি তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন— এই মানুষ ভয়কে শিল্পে পরিণত করেছে। সে প্রথমে শাসন করত ভয় দিয়ে,তারপর দয়া দিয়ে, তারপর আবার ভয় দিয়ে—যাতে মানুষ দয়ার কথা ভুলে না যায়।
রোমান্যার যেসব সেনাপতি সিজারের জন্য যুদ্ধ করছিল, তারা একসময় তার বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র করল। তারা ভেবেছিল—সিজার তরুণ, অহংকারী, নরম।
সিজার জানল। কিন্তু মারল না। বরং তাদের আমন্ত্রণ জানাল Senigallia শহরে—“মীমাংসার জন্য”।
মাকিয়াভেলি সেই শহরেই উপস্থিত ছিলেন।
রাত নামল। শত্রুরা এল—নিশ্চিন্ত, হাসতে হাসতে। সিজার তাদের আলিঙ্গন করল। ভোজ বসলো।
আর গভীর রাতে— একসাথে সবাই গ্রেপ্তার। ভোরের আলো ফোটার আগেই সবাই শিরশ্ছেদ। শহর জেগে দেখল—সব বিশ্বাসঘাতক এক রাতে ইতিহাস হয়ে গেছে।
মাকিয়াভেলি সেদিন বুঝলেন— প্রকৃত শাসক আগে বিশ্বাস জিততে জানে, তারপর জীবন নেয়।
রোমান্যাকে সিজার প্রথমে শাসন করেছিল তার এক নিষ্ঠুর সেনাপতি Ramiro de Lorqua দিয়ে। লোকটা দিনে দিনে মানুষ খুন করে শান্তি এনেছিল। রাস্তায় ডাকাত নেই। বিদ্রোহ নেই। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে ছিল নিখাদ আতঙ্ক।
একদিন সকালে মানুষ দেখল—শহরের মাঝখানে রামিরো দ’র্কো কাটা দেহ হয়ে পড়ে আছে। তার পাশে রক্তমাখা তলোয়ার। বার্তা ছিল একটাই— "নির্মমতা আমার ছিল না, আমার লোকের ছিল।”
জনগণ ভয় পেল। আবার ভালোবাসলও।
এই দ্বৈত খেলাটাই মাকিয়াভেলি শিখে নিয়েছিলেন নিখুঁতভাবে।
মাকিয়াভেলি দেখলেন - সিজার অপরাজেয় মনে হচ্ছে। কিন্তু সে এক ভয়ংকর ভুল করেছে— সে নিজের ভাগ্য একটা মানুষের হাতে তুলে দিয়েছে।
১৫০৩ সালে পোপ ষষ্ঠ আলেকজান্ডার মারা গেলেন। সিজার অসুস্থ হয়ে পড়ল। নতুন পোপ এল—শত্রু। এক রাতের মধ্যে সিজারের সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ল। যার সামনে সবাই কাঁপত, সে মানুষটা একদিন বন্দি হয়ে গেল।
মাকিয়াভেলি তখন বুঝলেন- ভাগ্যের ওপর যার রাজ্য দাঁড়ায়, ইতিহাস তার রাজত্ব বেশি দিন রাখে না।
মাকিয়াভেলি ফিরলেন ফ্লোরেন্সে। কিন্তু তিনি আর সে আর আগের মানুষ নেই। তিনি নিজের চোখে দেখেছেন-
• কীভাবে ভয় তৈরি করা হয়
• কীভাবে দয়া ব্যবহার করা হয় অস্ত্র হিসেবে
• কীভাবে এক রাতে ইতিহাস বদলানো যায়
এই মিশন কোনো কূটনৈতিক সফর ছিল না। এটা ছিল মাকিয়াভেলির রাজনীতিশাস্ত্রের জন্মভূমি। সিজার বোর্গিয়া তাকে শিখিয়েছে—
• শাসক নৈতিক হলে ভালো
• কিন্তু কার্যকর হতে গেলে নিষ্ঠুর হতে জানতেই হবে
• আর সবচেয়ে বড় কথা—ভাগ্যের ওপর ভর করে কেউ রাজা থাকে না
মাকিয়াভেলি শুধু লেখক বা দূত ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন- ভাড়াটে সৈন্যে রাষ্ট্র বাঁচে না। তিনি ফ্লোরেন্সের নাগরিকদের নিয়েই নিজস্ব মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তোলেন। কৃষক, জেলে, কামার—তাদেরই বানানো হলো সৈনিক।
১৫০৯ সালে এই বাহিনী দিয়েই তিনি পিসা পুনর্দখল করেন। এই জয় তাকে কেবল কূটনীতিক নয়, কার্যকর সামরিক সংগঠক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করে।
এই সময়টাই মাকিয়াভেলির ক্ষমতার শিখর।
তিনি কোনো রাজা না, কিন্তু রাজারা তার রিপোর্ট পড়ে সিদ্ধান্ত নেয়।
তবু তার ক্ষমতা ছিল কাগজের ওপর—একটি পদ, একটি প্রজাতন্ত্র, একটি রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে। আর রাজনীতি মানেই—ভূমিকম্প।
১৫১২। ভাগ্য আবার ঘুরে দাঁড়াল। স্পেনের সামরিক সহায়তায় মেডিচি পরিবার আবার ক্ষমতায় ফিরল। যারা প্রজাতন্ত্রের লোক ছিল, তারা সবাই সন্দেহভাজন। মাকিয়াভেলিও বাদ গেল না।
তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠল। তাকে গ্রেপ্তার করা হলো। দড়িতে ঝুলিয়ে পেটানো হলো। নখের ভেতর ঢোকানো হলো আগুন। শেষে তাকে নির্বাসনে পাঠানো হলো—ফ্লোরেন্সের বাইরে সান কাশিয়ানো এক ছোট গ্রামে।
যে মানুষটা রাজনীতির কেন্দ্র থেকে ইউরোপ দেখেছিলেন, তিনি এখন দিনের পর দিন আঙুর গাছ আর মুরগির খাঁচা দেখছেন।
নির্বাসনে গিয়ে তিনি আর কোনো পদ ফিরে পাননি। দিনের বেলা তিনি মাঠে যেতেন, কৃষকদের সঙ্গে বসে মদ পান করতেন। তাস খেলেন। ঝগড়া শোনেন। মাটি আর ঘামের গন্ধে ডুবে থাকেন।
কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই—
তিনি ঘরে ফিরে দরজা বন্ধ করতেন। কৃষকের পোশাক খুলে রাখতেন। পরিধান করতেন রাজদরবারের পুরোনো পোশাক।
এটা অভিনয় না। এটা ছিল তার মানসিক রক্ষা-কবচ।
তিনি নিজেই লিখেছেন—“আমি তখন প্রাচীন রাজাদের সঙ্গে বসি। তারা আমাকে তাড়ায় না। তারা আমার সঙ্গে কথা বলে।”
সেই সময়েই তার সামনে আবার ভেসে ওঠে—সিজার বোর্গিয়ার ঠান্ডা হাসি, পোপের নীরব ষড়যন্ত্র, রাজাদের ভয়ের চোখ।
এক রাত। বাইরে বাতাস। ভিতরে আগুন-নিভানো চুলা। কাগজের ওপর পড়ে একফোঁটা মোম। তিনি জানতেন—তিনি আর কোনোদিন ক্ষমতায় ফিরবেন না। তার নামে এখন “প্রজাতন্ত্রী”, মানে “বিশ্বাসঘাতক” শব্দটা জুড়ে গেছে।
ঠিক তখনই তার ভেতরে জন্ম নেয় এক নির্মম প্রশ্ন—“যদি শাসকরা নৈতিক না হয়, তবে রাজনৈতিক নৈতিকতা আদৌ কী?”
তিনি আর স্বপ্ন দেখেন না আদর্শ রাষ্ট্রের। তিনি কেবল হিসাব করেন—কীভাবে ক্ষমতা ধরে রাখা যায়।
কলম চলে। শব্দ পড়ে। নৈতিকতা ধীরে ধীরে ছিটকে পড়ে জানালা দিয়ে।
তিনি লিখে যান—শাসককে ভালো হতে হবে না, শাসককে কার্যকর হতে হবে। মানুষ ভালোবাসার চেয়ে ভয় বেশি মানে। শাস্তি একদিনে ভুলে না, কৃতজ্ঞতা ভুলে যায় এক রাতেই।
চুক্তি ভাঙা পাপ—যদি ভাঙার ফলেই রাজ্য বাঁচে, তবে সেই পাপই ধর্ম।
এই প্রতিটি লাইন আসলে তার জীবনের অভিজ্ঞতার রক্তচিহ্ন।
এই বই তিনি উৎসর্গ করলেন—মেডিচিদের তরুণ উত্তরাধিকারীকে। যে পরিবার তাকে গ্রেপ্তার করেছিল, নির্বাসনে পাঠিয়েছিল, গলা পর্যন্ত অপমান ডুবিয়েছিল—ঠিক সেই পরিবারের দরজায় সে পাঠাল এই পান্ডুলিপি।
বইটার নাম—
The Prince।
এটা কোনো ক্ষমা-পত্র না। এটা ছিল ক্ষমতার জন্য আবেদনপত্র। তিনি বলছিলেন না—“আমি ভালো মানুষ।”
তিনি বলছিলেন—“আমি রাজনীতির সবচেয়ে ভয়ংকর অন্দরমহলের মানচিত্র জানি।”
মেডিচিরা বই গ্রহণ করল। কিন্তু মানুষটিকে গ্রহণ করল না। কোনো পদ এল না। কোনো ডাক এল না। মাকিয়াভেলি রয়ে গেলেন নির্বাসিতই।
কিন্তু সময় আরেকটা নিষ্ঠুর খেলা খেলল—মেডিচিরা একদিন ইতিহাস হলো। আর The Prince হয়ে গেল রাজনীতির গোপন বাইবেল। যে বইটি লেখা হয়েছিল চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায়, সে বইই হয়ে উঠল ক্ষমতা বুঝে নেওয়ার সবচেয়ে নিষ্ঠুর পাঠ।
পুনশ্চঃ এক সময় এই বইটিও নিষিদ্ধ হয়েছিল, গির্জা এটাকে শয়তানের বই বললো, আর ইউরোপের সব রাজদরবারের আলমারিতে লুকিয়ে ঢুকে পড়ল- ওটাও আরেকটা রক্ত-মাখা ইতিহাস। আরেকদিনের জন্য তুলে রাখলাম।
চিত্র- মাকিয়াভেলির পোট্রেট। এঁকেছেন -শান্তি ডি টিটো

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!