লিবিয়ার পথে পথে - ৪

বিমানে ভ্রমন যতোই আরামদায়ক হয়, সেটা যদি হয় এগার ঘন্টার ভ্রমন, কোনোরকম যাত্রা বিরতি ছাড়াই, তাও আবার ইকোনমি ক্লাসে, কোনোভাবেই স্বাচ্ছন্দপূর্ণ হবার কথা নয়। এর উপরে আবার যদি সুন্দরী লিবিয়ান বিমানবালারা ইংরেজী কম জানে, তাহলে তো আরো সমস্যা। তাও সুন্দরী বিমানবালাদের ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজীতে বলে কিছু সাহায্য পাওয়া যায়, কিন্তু যখন সুন্দর বিমানবালাদের কাছে এক বোতল পানির কথা বললে শুনতে হয়, আপনাদের জন্য এক বোতলই বরাদ্দ এবং সেটা দেওয়া হয়ে গেছে, তখন মনে হয়েছিলো, ‘হা হুতোম্মি! এ যাচ্ছি কোথায়?’

এমনিতেই আমাদের যাত্রা ছিলো রাতে, তার উপরে এই রকম অভ্যর্থনা, লিসাকে দেখলাম খুব তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়লো। বিপদে পরলাম আমি। আমি হচ্ছি নিশাচর, এগার ঘন্টা বসে বসে ঘুমানোটা আমার জন্য একরকম অসম্ভব ব্যাপারই। জেগে রইলাম আমি। এই জেগে থাকার জন্যই হয়তোবা শুনতে পেলাম তার ফোঁপানো কান্না!

আমাদের থেকে দুই আসন সামনে বসা। এক সিষ্টার। প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে যাচ্ছে। সেটাও কান্নার উপলক্ষ্য নয়, তার তিন বছরের একমাত্র ছেলেকে বাংলাদেশে রেখে আসতে হয়েছে, এটাই একমাত্র কারণ। মনে হলো, আমি যাচ্ছি হয়তোবা অভিজ্ঞতার জন্য অথবা ঘুরে বেড়ানোর জন্য, অর্থনৈতিক ব্যাপারটা এতটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, কিন্তু এইসব সিষ্টারদের কাছে সেটাই প্রধান কারণ। লিবিয়া সরকারের এই চাকরী পাবার জন্য এজেন্সিতে তাদের জমা দিতে হয়েছে এক লাখ টাকার উপরে, যেখানে সরকারী থেকে নির্দিষ্ট করা ছিলো মাত্র পয়ত্রিশ হাজার টাকা। তাও এরা কোনো উচ্চবাচ্য করেনি, স্বপ্ন দেখেছে লিবিয়াতে গিয়েই অল্প কয়েক মাসের ভিতরেই টাকা তুলে ফেলবে, তারপর শুরু করবে সঞ্চয়। একসময় বিপুল টাকা নিয়ে দেশে ফিরে এসে সংসারকে সুন্দর করে সাজাবে, সন্তানকে ভালোভাবে বড়ো করবে। এর জন্য কত কষ্ট! তিন বছরের ছেলেকে ছাড়া থাকার কতো যন্ত্রনা! এইসব কথা চিন্তা করতে করতে কখন যেনো দুই চোখের পাতা এক হয়ে গেলো বুঝতেই পারি নি।

সচকিত হয়ে উঠলাম বিমানবালার আরবী উচ্চারনে ‘Good Morning’ শুনে, সকালের নাস্তা নিয়ে এসেছে। পাশ থেকে লিসা উত্তেজিত হয়ে বললো, ‘দেখো, দেখো! নীলাকাশ!’ আমার চোখ লিসাকে অতিক্রম করে জানালা দিয়ে বাইরে চলে গেলো। যদিও বিমানের পাখির মতো ডানাটা খুব সমস্যা করছিলো, তারপরো নীল আকাশের নীচে সাদা মেঘের ভেলা দেখে আমি যেনো থমকে গেলাম। ভাগ্যিস আমি কবি নই! তাহলে এই একটা বিষয় নিয়েই কবিতা লিখে আমি বাংলাদেশের সব কবিদের পিছনে ফেলে দিতাম! তাই মুগ্ধ নয়নে শুধু চেয়ে থাকলাম।

পাশ থেকে লিসা উত্তেজিত হয়ে বললো, ‘দেখো, দেখো! নীলাকাশ!’

কিছুক্ষন পরে ঘোষনা দেওয়া হলো সীটবেল্ট বাঁধার জন্য, আর অল্প সময় পরেই আফ্রিকিয়া এয়ারলাইন্সের বিশাল A330- এয়ারবাসটি ত্রিপলী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করবে। আমাদের সবার ভিতর একটা সাজ সাজ রব শুরু হলো, সাথে এক উদ্বেগ! পরিচিত পরিবেশের সবকিছু ছেড়ে নতুন অপরিচিত পরিবেশে আসার উদ্বেগ! আমাদেরকে বলা হলো, এয়ারপোর্টের বাইরের তাপমাত্রা ১৪°- এর মতো। আমরা সবাই গরম কাপড় গায়ে দিয়ে বিমান থেকে নামলাম, পা দিলাম লিবিয়ার মাটিতে, আফ্রিকা মহাদেশে!

ত্রিপলী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট (ছবি গুগল থেকে সংগৃহিত)

ত্রিপলী এয়ারপোর্ট লিবিয়ার সবচেয়ে বড় এয়ারপোর্ট। ত্রিপলী থেকে ৩৪ কিলোমিটার দক্ষিনে বেন ঘাসির নামক জায়গায় এটি অবস্থিত। এই এয়ারপোর্টে লিবিয়ান এয়ারলাইন্স, আফ্রিকিয়া এয়ারওয়েজ এবং বোরাক এয়ারের হেড কোয়ার্টার অবস্থিত। বোরাক এয়ার হচ্ছে লিবিয়ার প্রথম এবং একমাত্র ব্যক্তি মালিকানাধীন কোম্পানী, লিবিয়ান সিভিল ওয়ারের জন্য ২০১১ সালে এটি বন্ধ হয়ে যায়। ত্রিপলী বিমানবন্দরটি খুব বেশি বড়ো নয়। একটি মাত্র প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল। ঘরোয়া এবং ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটসমূহের জন্য চেক-ইন এবং এরাইভাল (Arrival) ফ্যাসিলিটিজ একই বিল্ডিং-এ অবস্থিত, তবে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায়। পাঁচ তলা এই ভবনটি ৩৩,০০০ বর্গ মিটার এলাকার উপর তৈরী হয়েছে। এখানে দিনরাত ২৪ ঘন্টা কাজ চললেও যাত্রীদের রাতে থাকার জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। চার তলাতে একটি মাত্র রেস্টুরেন্ট আছে। এমিরেটসের বিজনেস ক্লাসের জন্য একটা এবং ইকোনমি ক্লাসের জন্য একটা লাউঞ্জ এবং প্রায় বাকী সব এয়ারলাইন্সের বিজনেস ক্লাসের জন্য আরেকটি লাউঞ্জের সুব্যবস্থা আছে।

লম্বা করিডোর দিয়ে যখন ইমিগ্রেশনের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন দেখি এয়ারপোর্টের ভিতরেই প্রকাশ্যে কিছু কর্মকর্তা (পোশাক দেখে তাই মনে হলো) সিগারেট টানছে, এবং সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ভিতরেই ফেলছে! আমরা যখন এয়ারপোর্টে নামি, তার একটু পরে ইউরোপ থেকে আরেকটি ফ্লাইট আসে। ইমিগ্রেশনের লাল দাগের বাইরে আমরা অপেক্ষাতেই থাকি, আর সেই ইউরোপীয় ফ্লাইটের প্যাসেঞ্জাররা এসে আগে আগে চলে যায়। আমরা নিজেরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্তে পৌছলাম, আমাদের ফ্লাইট বাংলাদেশ থেকে এসেছে বলে এই বিশেষ সংবর্ধনা!

অবশেষে সমস্ত বাধা বিপত্তি পেরিয়ে আমরা এয়ারপোর্টের বাইরে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এলাম। আসলে আমরা যারা বাংলাদেশ থেকে এসেছি, তাদেরকে এক ব্যক্তি পাসপোর্টে সিল দেবার সময়ই বলে দিয়েছিলো কোথায় যেতে হবে। আমরা জানতাম, এয়ারপোর্ট থেকে হেলথ মিনিস্ট্রির লোক এসে আমাদের সবাইকে হোটেলে নিয়ে যাবে, সেখানে দুই-তিনদিন থাকতে হবে, এরপর সরকারীভাবে আমাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় পোস্টিং দেওয়া হবে, আমরা সেইসব জায়গায় চলে যাবো। আর যারা স্বামী এবং স্ত্রী দুইজনেই এসেছে (আমাদের ফ্লাইটে আমরাসহ আর মাত্র একটি পরিবার ছিলো), তারা একই হাসপাতালে পোস্টিং পাবে।

নির্দিষ্ট জায়গায় এসে আমরা হেলথ মিনিষ্ট্রির এমন তিনজন লোককে পেলাম, যারা একদমই ইংরেজী জানে না (পরে দেখেছি- লিবিয়ার সরকারী অফিসগুলোর বেশিরভাগ লোকই ইংরেজী জানে না!)। তারা ইশারায় আমাদের কাছ থেকে পাসপোর্ট নিচ্ছে, আর নাম দেখে (পাসপোর্টে আরবী ট্রান্সক্রিপশন ছিলো) এয়ারপোর্টের বাইরে দন্ডায়মান আট – নয়টি বিশেষ গাড়ির মধ্যে যার যার নির্দিষ্ট গাড়িতে উঠতে বলছে। আমাদের সাথে থাকা এক সিস্টার, যিনি এর আগে সৌদি আরবে বেশ কয়েক বছর কাজ করেছেন, ভালো আরবী বলতে জানে, সে ঐ তিন লোকের সাথে কথা বলে আমাদেরকে যা জানালো, তার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না! এয়ারপোর্ট থেকেই না কি যার যার হাসপাতালের এলাকায় পাঠিয়ে দিচ্ছে। আমি যখন আমার পাসপোর্ট দিলাম, আমাকে একটা প্রাইভেট কার দেখিয়ে দিলো। আট – নয়টি গাড়ির মধ্যে একমাত্র সেটাই প্রাইভেট কার এবং আমি জানতে পারলাম আমার পোস্টিং গারিয়ান টিচিং হাসপাতালে, ত্রিপলি থেকে আশি কিলোমিটার দক্ষিনে আর লিসার পোস্টিং আমার এলাকা থেকে প্রায় ১৪০০ মাইল দূরের বেনগাজী, লিবিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরে!

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!