আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম

আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম

আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম।
হঠাৎ করে। কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই।
দুপুরবেলা—যে সময় শহরটা কাঠের মতো নিরব থাকে। রোদ তখন শব্দ শুষে নেয়, মানুষগুলো নিজেদের ভেতরে গুটিয়ে থাকে। কেউ ছিল না। কেউ থাকেনি। আবার একজন ছিল—যাকে হিসাবের খাতায় ধরা হয় না।
একজন মানুষ।
একজন সিকিউরিটি গার্ড।
তিনি আমাকে সেই নিস্তব্ধ দুপুরে স্কয়ার হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন। কোনো আত্মীয়ের তাড়া ছিল না, বন্ধুর ফোন ছিল না, কোনো পরিচয়ের জোর ছিল না। শুধু একটি হাত, আর সেই হাতের সাহস—যেন হঠাৎ করে আল্লাহ কাউকে পাঠিয়ে দিয়েছেন, বলে দিয়েছেন, “এই মানুষটাকে আজ একা মরতে দিও না।”
হাসপাতালে ঢুকেই প্রশ্নগুলো শুরু হয়।
মোবাইলটা কোথায় থাকবে?
কার্ড হোল্ডার, আইডি কার্ড, জামা-কাপড়—ফেলে দেব, না কেউ নিজের মতো করে রেখে দেবে?
এই প্রশ্নগুলো অসুখের চেয়েও ভারী। কারণ এগুলো শরীরের না, এগুলো একাকীত্বের প্রশ্ন।
খুব পাতলা ভিড় থেকে একজন এগিয়ে এসেছিলেন। হাসপাতাল এগিয়ে আসেনি। আসলে আমাদের হাসপাতালগুলো এখনো একা মানুষদের জন্য তৈরি হয়নি। সিস্টেম ধরে নেয়—তোমার সঙ্গে কেউ থাকবে।
স্কয়ার হাসপাতাল তো বিশেষ করেই না।
হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিটে অনেকে দেখতে এসেছিল। পরিচিত মুখ দেখলে ভালো লাগে। আবার কষ্টও লাগে। কত কষ্ট করে আসে মানুষ। সান্ত্বনা দেয়। উপদেশ দেয়। বলে—
“এবার ডিসিপ্লিন্ড জীবন চালাতে হবে।”
কথাটা ঠিক।
কিন্তু উপায়টা কোথায়?
একাকী মানুষের জীবনে ডিসিপ্লিন মানে কী—তা কেউ শেখায় না। শেখায় শুধু নিয়ম। নিয়ম মানতে গেলে আবার মানুষ লাগে।
হাই ডিপেন্ডেন্সি ইউনিট থেকে কেবিনে যেতে হলেও মানুষ লাগে। একা মানুষেরও মানুষ লাগে। না হলে সে কোথাও যেতে পারে না। শারীরিকভাবে নয়—প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই সে আটকে যায়।
কখনও কখনও মনে হয়, একা মানুষের জন্য আল্লাহ নিজেই লোক পাঠান।
হঠাৎ করে। অচেনা মুখে। সিকিউরিটি গার্ডের পোশাকে। নার্সের নিরব সহানুভূতিতে। কিংবা কোনো অদ্ভুত কাকতালীয়তায়।
বেঁচে যাই এভাবেই।
বারবার।
কিন্তু আর কতবার?
একজন মানুষ যখন একা থাকে, তখন পৃথিবীটাও তার কাছে একা হয়ে যায়। হাসপাতাল, শহর, নিয়ম—সব কিছু তখন দূরের, ঠান্ডা, নিষ্ঠুর।
একা মানুষ কাউকে দোষ দেয় না। শুধু ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
একা মানুষ।
একা পৃথিবী।
একা জীবন।
এই একাকীত্ব চিৎকার করে না। শব্দ করে না।
এটা শুধু ধীরে ধীরে মানুষটাকে ভিতর থেকে ফাঁকা করে দেয়—
যেন কেউ ছিল, অথচ ছিল না।
 

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!