ঈদের চাঁদের নিচে একা মানুষ
------------------------------
ঈদের চাঁদ উঠার খবরটা সবার আগে আসে টেলিভিশনে, এরপর ফেসবুকে, তারপর মসজিদের মাইকে, সবশেষে মানুষের মুখে মুখে। কিন্তু তার ঘরে চাঁদের আলো ঢোকে না। ঢোকে শুধু শব্দ—দূরের উল্লাস, হাসির ভাঙা প্রতিধ্বনি, আর এক ধরনের অদ্ভুত নীরবতা।
তার নাম কেউ খুব একটা ডাকে না এখন। একসময় ছিল—নাম ধরে ডাকলে সে ঘুরে তাকাত, হেসে উঠত, হাত বাড়িয়ে দিত। এখন নামটা যেন কোথাও আটকে আছে, শুধু কাগজের মধ্যে। পরিচয় বলতে অফিসের ফাইল, আর ব্যাংকের একাউন্ট নম্বর।
একসময় সে ভালোবেসে বিয়ে করেছিল। খুব বেশি নাটকীয়ভাবে কিছু না—দুজন মানুষ, নিজেদের মতো করে একটা পৃথিবী বানাতে চেয়েছিল। প্রথমদিকে সবকিছুই ছিল সহজ। ছোট একটা বাসা, দেয়ালে দুটো ফ্রেম করা ছবি, রান্নাঘরের গন্ধ, রাতের গল্প। তারপর এল দুটো মেয়ে—তার দুই রাজকন্যা। ছোট ছোট হাত, অস্ফুট কথা, রাতের কান্না, সকালবেলার হাসি। তখন তার মনে হতো, পৃথিবীর সবকিছুই সে সামলে নিতে পারবে।
কিন্তু পৃথিবী তো কারও জন্য থেমে থাকে না।
কীভাবে, কখন, কোথায়—সে নিজেও ঠিক বলতে পারে না—সবকিছু ভেঙে গেল। সম্পর্কের ভেতরে জমে থাকা নীরবতা একসময় দেয়াল হয়ে দাঁড়াল। একদিন দেখল, একই ছাদের নিচে থেকেও তারা আলাদা মানুষ। তারপর একদিন সত্যিই আলাদা হয়ে গেল।
কারো দোষ ছিল, না কি দুজনেরই—সে বিচার করার মতো শক্তি তার আর নেই। শুধু জানে, সে একা হয়ে গেছে।
সেই থেকে সবগুলো দিন তার জন্যে কষ্টের দিন। আর সেগুলোর মধ্যে ঈদের দিনগুলো সবচেয়ে কষ্টের।
সকালে ফজরের পর ঘুম আসে না। আগে এই সময় ঘরে কত শব্দ হতো—কেউ নতুন জামা পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কেউ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ চিৎকার করে বলছে, “আব্বু, দেখো না!” এখন ঘরটা অদ্ভুতভাবে গুছানো। সবকিছু ঠিকঠাক জায়গায়। কোনো বিশৃঙ্খলা নেই, কোনো চিহ্ন নেই জীবনের।
সে ধীরে ধীরে উঠে বসে। চা বানায়। কাপটা হাতে নিয়ে জানালার পাশে বসে থাকে। বাইরে রাস্তায় মানুষ হাঁটছে, কেউ কেউ নতুন পাঞ্জাবি পরে। দূরে কোথাও গরুর গোশতের কিংবা সেমাইয়ের গন্ধ ভেসে আসে।
সে ভাবে—এই শহরে তার মতো আর কেউ আছে কি?
মোবাইল ফোনটা টেবিলে পড়ে থাকে। একসময় এই দিনগুলোতে ফোন থামত না। শুভেচ্ছা, দাওয়াত, আত্মীয়স্বজনের খোঁজ। এখন মাঝে মাঝে কোনো ব্যাংকের মেসেজ আসে, বা ভুল করে কেউ ফোন দেয়। সে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু ফোনটা খুব কমই বাজে।
তার দুই মেয়ের কথা মনে পড়ে।
এখন তারা বড় হয়ে গেছে নিশ্চয়ই। হয়তো অন্য শহরে, অন্য জীবনে। তাদের নিজস্ব গল্প আছে। সে জানে না তারা তাকে মনে রাখে কি না। কখনো কখনো মনে হয়, হয়তো তারা ভুলেই গেছে। আবার কখনো মনে হয়, হয়তো রাতের কোনো নিঃশব্দ মুহূর্তে তারা হঠাৎ তার কথা ভাবে—যেমন সে ভাবে।
কিন্তু কেউ কাউকে ফোন করে না।
দুপুর গড়িয়ে যায়। সে কিছু খায়—অথবা খায় না। টিভি চালিয়ে বসে থাকে, কিন্তু কিছুই দেখে না। শব্দগুলো কানে ঢুকে, আবার বের হয়ে যায়।
বিকেলের দিকে আলো একটু নরম হয়ে আসে। এই সময়টা আগে খুব প্রিয় ছিল তার। মেয়েদের হাত ধরে ছাদে যাওয়া, দূরে তাকিয়ে থাকা, গল্প করা। এখন সে একা ছাদে উঠে যায় না। কারণ ওপরে উঠলে মনে হয়, কেউ নেই পাশে।
রাত নামলে শহর আবার বদলে যায়। কোথাও কোথাও আলো জ্বলে, কোথাও গান বাজে। কিন্তু তার ঘরটা একই থাকে—অন্ধকার, নিঃশব্দ।
সে বিছানায় শুয়ে পড়ে।
ঘুম আসে না সহজে। চোখ বন্ধ করলে ভেসে ওঠে কিছু দৃশ্য—একটা ছোট মেয়ে তার আঙুল ধরে হাঁটছে, আরেকজন বলছে, “আব্বু, তুমি থাকলে ভালো লাগে।” তারপর সেই দৃশ্যগুলো আস্তে আস্তে ঝাপসা হয়ে যায়।
সে বুঝতে পারে, সে এখন আর কারো গল্পের অংশ না।
শুধু নিজের ভেতরেই সে বেঁচে আছে—একটা দীর্ঘ, ধীর, অদৃশ্য অপেক্ষার মধ্যে।
মৃত্যুর জন্য না—হয়তো শেষ হয়ে যাওয়ার জন্য।
ঈদের রাত শেষ হয়। অন্যদের জন্য এটা ছিল আনন্দের দিন। তার জন্য, আরেকটা দিন পার হয়ে গেল।
পরের দিন সকালে আবার সূর্য উঠবে।
আর সে, একইভাবে, আবার একা হয়ে উঠবে।
----