এক সভ্যতার প্রাণ ছুঁয়ে দেখে ফিরলাম

নীল নদ তখন সন্ধ্যার রঙে রাঙানো—আকাশের গাঢ় নীলাভ ছায়ায় নদীর জল যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে। সূর্যটা পশ্চিমে হেলে পড়ছে ধীরে ধীরে, আর আমাদের জাহাজ মৃদু ঢেউ কেটে এগিয়ে চলেছে। হঠাৎ ঘোষণা এল—"কম ওমবো!" জাহাজের ম্যানেজার এসে বললেন, “সময় আছে মাত্র এক ঘণ্টা। দ্রুত ঘুরে আসুন।”
 
আমি আর দেরি করিনি। ব্যাগে শুধু ফোন আর পানির বোতল রেখে জাহাজ থেকে নামলাম। আজ আমি গাইড নিইনি। ইচ্ছা করেই। চেয়েছিলাম নিজের মতো করে হারিয়ে যেতে, অনুভব করতে মন্দিরের প্রতিটি খোদাই, প্রতিটি স্তম্ভ, প্রতিটি দ্যোতনার আবহ।
 
নদীর পাড় থেকে মন্দিরটা খুব দূরে নয়। বিশাল পাথরের পাইলন, দাঁড়িয়ে আছে অনাড়ম্বর অথচ অসীম গম্ভীরতায়—যেন প্রাচীন কোনো রাজপুরোহিত এখনও পাহারা দিচ্ছেন। সামনে লেখা, “Temple of Sobek and Haroeris”। দ্বৈত মন্দির—একদিকে কুমির-দেবতা সোবেক, অন্যদিকে বাজপাখিমুখী হারোরিস।
 
বাইরের দেয়াল ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম। পাথরের গায়ে সূক্ষ্ম রিলিফ, কোথাও যুদ্ধদৃশ্য, কোথাও দেবতার আরাধনা। ছাদের দিকে তাকালাম—খুঁজছি জ্যোতির্বিজ্ঞানের খোদাই, সেই বিখ্যাত ক্যালেন্ডার-রিলিফ। কিন্তু সন্ধ্যার আলোয় কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আলো এত কম যে প্রতিটা রেখাই যেন মিলিয়ে যাচ্ছে ছায়ার সাথে।
 
তবু আশা ছাড়িনি। এক দেয়াল থেকে আরেক দেয়ালে, গায়ে হাত বুলিয়ে খুঁজে চলেছি সেই রিলিফ—যেটা এক চিকিৎসক হিসেবে আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। বিশ্বের প্রাচীনতম চিকিৎসা যন্ত্রের খোদাই, যেটা শুধু ইতিহাস না, একজন হেলথ প্রফেশনালের আত্মপরিচয়ের অংশও। কিন্তু খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সময় ফুরিয়ে আসছে।
 
তখনই মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। আশেপাশে অনেক ট্যুরিস্ট দল, ছোট ছোট টীম—সবাই গাইড নিয়ে এসেছে। আমি একদম নীরবে একটা দলের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম, কান খাড়া করে দিলাম। কখন গাইড বলবে—“This is the wall with medical instruments…”
 
হঠাৎ এক গাইড থেমে গেলেন, এবং বললেন, “Now, this is something very unique in Egyptian temples. Look closely—these are ancient **surgical instruments**…”
আমি শিহরিত! এই তো সেই দেয়াল! চোখের সামনে তখন বিশাল এক ফ্ল্যাট স্টোনের ওপর খোদাই করা রয়েছে অবিশ্বাস্য কিছু বস্তু। স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে ধারালো ছুরি বা স্ক্যালপেল, টুইজার, ফোর্সেপ, কাঁচি, এমনকি স্পেকুলাম পর্যন্ত! পাশাপাশি রয়েছে ছোট পাত্র, যেগুলো সম্ভবত ওষুধ রাখার জন্য ব্যবহার হতো।
 
রিলিফটির নিচের দিকে ওজন নির্ণায়ক ছোট পাত্র, আর ওপরে সার্জিক্যাল যন্ত্রগুলো এমনভাবে সাজানো যে, তা দেখে মনে হয় যেন একটা চিকিৎসা কিট সযত্নে গুছিয়ে রাখা হয়েছে। পাশে হায়ারোগ্লিফিক লেখা, যা হয়তো যন্ত্রগুলোর নাম বা উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করছে।
 
প্রচলিত ধারণায়, ধর্ম আর চিকিৎসা দুই ভিন্ন জগত—কিন্তু এই দেয়াল ভেঙে দিয়েছে সে বিভাজন। প্রাচীন মিশরীয়রা মনে করত, রোগ নিরাময় দেবতার আশীর্বাদ এবং মানবিক দায়িত্ব—আর চিকিৎসকরা ছিলেন সেই ধর্মীয় দায়িত্বের ধারক।
 
একদৃষ্টিতে আমি তাকিয়ে রইলাম সেই দেয়ালের দিকে। হাজার বছর আগের কোনো পুরোহিত হয়তো এখানেই দাঁড়িয়ে রোগীর চিকিৎসা করতেন, তার পেছনে খোদাই করা সেই যন্ত্রগুলোর দিকে তাকিয়ে। আমার সামনে তখন শুধু পাথরের রিলিফ নয়, বরং ইতিহাস, বিশ্বাস, বিজ্ঞান আর মানবিকতার এক অপূর্ব মূর্ত রূপ।
 
জাহাজে ফেরার সময় মনে হচ্ছিল, আমি যেন শুধু এক মন্দির নয়, এক সভ্যতার প্রাণ ছুঁয়ে দেখে ফিরলাম। অন্ধকারে খুঁজে পাওয়া সেই দেয়ালটাই যেন আমার পুরো মিশর ভ্রমণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলো।
 
 

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!