এমন এক বিকেলই হয়তো যথেষ্ট

আমি যে কতদিন ঈদ করি না—ঠিক করে মনে পড়ে না। হৃদয়ের ভেতর কোথা থেকে যেন উৎসাহের সে দীপ্ত শিখাটাও নিভে গিয়েছিল বহু আগেই। ঘড়ির কাঁটায় ঈদের দিন আসে, যায়; কিন্তু তাতে আর আমার ভেতরের আকাশে নতুন চাঁদ ওঠে না। মনে হয়, ধীরে ধীরে চারপাশের মানুষগুলোও সেই চাঁদের আলো থেকে সরে যাচ্ছে, ম্রিয়মাণ হয়ে পড়ছে। যাদের একদিন ভাবতাম হৃদয়ের খুব কাছের, তাদের সঙ্গে এখন শব্দের দূরত্ব, স্পর্শের শূন্যতা। আর যাদের সঙ্গে নতুন করে বন্ধনের আশ্বাস খুঁজতে চাই, তারাও যেন কোনও অদৃশ্য বেড়ার ওপারে থাকে, ঠিক নাগালের বাইরে।
 
তবু এই ক্লান্ত, নির্জন ঈদের দিনগুলোতে হঠাৎ করেই যেন কোনো এক মায়াবী পর্দা সরে গেল গতকালের বিকেলে। বহুদিনের অগোছালো, ধুলিধূসর স্মৃতির পটে হঠাৎ রঙের ঝলকানি এলো। বাল্যকালের প্রায় সব বন্ধুরা একেকজন একেক পদের বাহার নিয়ে এসে হাজির।
 
কেউ গরুর মাংস রান্না করেছে গাঢ় মশলায় ডুবিয়ে, কেউ এনেছে মসৃণ চালের রুটি—আদিগন্ত শিশির ছোঁয়া সকালে মায়ের হাতে গড়া রুটির মতো নরম। কারো হাতের পোলাও, কারো পুডিং, ঝকঝকে মিষ্টি, পুরোনো ঢাকাই বাকরখনি আর শিশির ভেজা সেমাইয়ের মোহময় গন্ধে ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল এক অদ্ভুত ঈদ-গন্ধ, যেন হারিয়ে যাওয়া কোনো দুপুরের ছায়া ফিরে এলো।
তারপর খেলতে বসলাম—কার্ড খেলা। কে জিতছে, কে হারছে—তা যেন খুব বড় কথা ছিল না। বরং পুরোনো আড্ডার শব্দ, অজস্র মুখরিত হাসি, একেকটা মুখে ছড়িয়ে পড়া অদৃশ্য ভালবাসার রেখা—এসবের ভেতর দিয়ে সময়টা গলে যাচ্ছিল, এক অনিবার্য মধুরতায়।
 
আজকাল তো বন্ধুও আর তেমন থাকে না। ব্যস্ততা, পারস্পরিক দূরত্ব, জীবন যাপনের নানান প্রতিযোগিতার ভেতর দিয়ে একেকজন যেন হারিয়ে যায় নিজের ঘেরাটোপে। অথচ এই ভাঙাচোরা সময়ের মধ্যে এরা আমাকে মনে রেখেছে—এটাই বা কম কী? ঈদের তৃতীয় দিনে এসে, তাদের হাতে গড়া সেই ছোট্ট মিলনমেলায় আমার নিভে যাওয়া ঈদ যেন নতুন করে জেগে উঠল।
 
হ্যাঁ, হয়তো ঈদ আর সেই পুরোনো ছেলেবেলার মতো করে আসে না; কিন্তু এই ভাঙা ভাঙা দিনেও কোনো অপ্রত্যাশিত বিকেলে পুরোনো বন্ধুদের হাসিতে, গন্ধে, মুখরতার ভেতর দিয়ে নতুন এক ঈদের শুরু হয়ে যেতে পারে। এবং আমি—অভিভূত হয়ে সেই শুরুটুকু গ্রহণ করলাম।
 
মাঝে মাঝে, এমন এক বিকেলই হয়তো যথেষ্ট।

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!