১৯২৩ সালের এপ্রিল মাস!
এডওয়ার্ড স্ট্যানহোপ মলিনিউ হারবার্ট—কার্নারভনের পঞ্চম আর্ল—জীবনের এই সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষের একজন হওয়ার কথা ছিল।
তিনি ছিলেন ধনী, ইংল্যান্ডে তাঁর বিশাল এস্টেট, বিখ্যাত রেসের ঘোড়া পালার খ্যাতি। তার ওপর, ১৯২২ সালের নভেম্বর মাসে মিশরে প্রত্নতত্ত্ববিদ হাওয়ার্ড কার্টারের সঙ্গে মিলে তিনি আবিষ্কার করেছিলেন ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত সমাধি—ফারাও তুতানখামুনের কবর। সারা পৃথিবী তাঁকে চিনত “কিং টুট”-এর আবিষ্কারক হিসেবে।
কিন্তু সেই অবিশ্বাস্য আবিষ্কারের মাত্র পাঁচ মাস পর, কার্নারভন ছিলেন ভীষণ অসুস্থ ও ক্লান্ত। বহু বছর আগে এক ভয়াবহ গাড়ি দুর্ঘটনার পর থেকেই তাঁর স্বাস্থ্য দুর্বল ছিল। তার ওপর মিশরের প্রচণ্ড মরুভূমির গরম, টানা উত্তেজনা, আর অসংখ্য দর্শক ও সংবাদকর্মীর চাপ—সব মিলিয়ে তাঁর শরীর আর সইতে পারছিল না।
ঠিক সেই সময়, এক সামান্য ঘটনাই সবকিছু পাল্টে দেয়। গালে একটি মশার কামড়। ১৯২২–২৩ মৌসুম শেষে সমাধি বন্ধ করার সময় কোনো একদিন সেই কামড়টি হয়। পরে শেভ করতে গিয়ে তিনি সেখানে কেটে ফেলেন। ক্ষতটি সংক্রমিত হয়। জ্বর আসে, গলার গ্রন্থি ফুলে যায়। লুক্সোরের হোটেলে এক ডাক্তার তাঁকে কয়েক দিন সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে বলেন।
কিছুটা ভালো বোধ করতেই তিনি সেই উপদেশ উপেক্ষা করেন। বিশ্রামের বদলে তিনি চলে যান কায়রো—মিশরের রাজধানীতে।
এরপর সময় দ্রুত অন্ধকার হয়ে আসে।
১৯২৩ সালের ৬ এপ্রিল ভোরে, কার্নারভন মৃত্যুশয্যায়। তাঁর অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছিল, আর সারা বিশ্বের পত্রিকায় তাঁর অসুস্থতার খবর ছাপা হচ্ছিল। ঠিক তখনই এক রহস্যময় নারী সামনে আসেন। নাম মেরি ম্যাকে—নিজেকে তিনি বলতেন ম্যারি কোরেলি। তাঁর দাবি ছিল, আগের জীবনে তিনি প্রাচীন মিশরের এক রাজকুমারী ছিলেন।
তিনি নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ একটি চিঠি লেখেন। সেখানে তিনি বলেন, তার কাছে একটি দুর্লভ বই আছে, যেখানে লেখা—যে কেউ সিল করা কোনো সমাধিতে প্রবেশ করলে ভয়ংকর শাস্তি ভোগ করবে। বইটিতে নাকি বলা আছে, কিছু বাক্সে গোপন বিষ লুকিয়ে রাখা হয়েছে এমনভাবে যে, যারা তা স্পর্শ করবে, তারা বুঝতেই পারবে না কীভাবে তাদের সর্বনাশ হচ্ছে। তারপর তিনি প্রশ্ন তোলেন—কার্নারভনের এই অবস্থা কি সত্যিই শুধু একটি মশার কামড়ের ফল?
তিনি আরও লেখেন, বইটিতে একটি অভিশাপের কথাও আছে—
“ডানায় ভর করে মৃত্যু আসে সেই ব্যক্তির কাছে, যে কোনো ফারাওয়ের সমাধিতে প্রবেশ করে।”
এই বইটির কোনো অস্তিত্ব আজ পর্যন্ত কেউ খুঁজে পায়নি।
এদিকে কার্নারভনের অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে। কায়রোর হোটেল কন্টিনেন্টালে তাঁর বিছানার পাশে দিনরাত থাকতেন তাঁর স্ত্রী লেডি আলমিনা। কাছে ছিলেন তাঁর বোন ও মেয়ে। তাঁর ব্যক্তিগত সচিব রিচার্ড বেতেল লুক্সোরে থাকা হাওয়ার্ড কার্টারকে টেলিগ্রাম পাঠান—“কার্নারভন গুরুতর অসুস্থ।”
কার্টার তড়িঘড়ি কায়রোতে ছুটে আসেন। ৫ এপ্রিল এসে পৌঁছান কার্নারভনের ছেলে হেনরি, যিনি খবর পেয়ে ভারত থেকে ছুটে এসেছিলেন। তিনি বাবার অচেতন দেহ দেখে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েন।
রাত প্রায় দুইটার সময় এক নার্স তাঁকে জাগিয়ে তোলে।
তার বাবা মারা গেছেন।
পরে হেনরি লেখেন, ঠিক সেই মুহূর্তে হোটেলের সব আলো একসঙ্গে নিভে গিয়েছিল। আর ইংল্যান্ডে, তাদের পারিবারিক প্রাসাদ হাইক্লিয়ারে, কার্নারভনের প্রিয় কুকুরটি হঠাৎ হাউল দিতে দিতে লুটিয়ে পড়ে মারা যায়।
এই খবর—মৃত্যু, নিভে যাওয়া আলো, আর কুকুরের হাউল—আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ মনে করতে শুরু করে, মেরি কোরেলির কথাই সত্যি।
এইভাবেই জন্ম নেয় এক ভয়ংকর কিংবদন্তি—
কিং টুটের অভিশাপ।
পুনশ্চ: ফারাও তুতানখামুন তার জীবদ্দশায় মিশরের কোনো বিখ্যাত ফারাও ছিলেন না। ছিলেন খুবই অখ্যাত একজন। বালক বয়সেই খুন হওয়া এই ফারাও হঠাৎ করে বর্তমান বিশ্বে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছিলেন তার সমাধি অক্ষত আবিষ্কার হওয়ায়। কিং টুট নিয়ে মাঝে মাঝে লিখব। এটা প্রথম পর্ব।
প্রশ্ন: ছবিতে লর্ড কার্নারভন কোনজন?