--------------------------------------
দুপুরটা এমন, যেন শহরের ওপর আগুন ঢেলে দিয়েছে কেউ। ঢাকার রাস্তা ফাঁকা না—কিন্তু আজকের ভিড়টা অন্যরকম। সবাই যেন কোথাও যাচ্ছে, কারো না কারো কাছে। শুধু সে ছাড়া।
রিকশার ছাউনিটা অর্ধেক নামানো। তবুও রোদের তাপ এসে লাগে মুখে। সে মাথা একটু নিচু করে বসে আছে। কোথাও যাওয়ার নেই, তবুও যাচ্ছে। শুধু চলার জন্যই চলা।
রিকশাওয়ালা মাঝে মাঝে পেছনে তাকায়। এমন যাত্রী সে কমই পায়—যে ভাড়া ঠিক করে না, গন্তব্য বলে না, শুধু বলে,
“চালান… যেদিকে ইচ্ছা।”
কিছুদূর যাওয়ার পর রিকশাওয়ালা নিজেই কথা শুরু করল।
“ভাই, কই যামু?”
সে একটু হেসে বলল, "আপনার ইচ্ছা। আজ তো আপনারই দিন।”
রিকশাওয়ালা হেসে ফেলল।
“আমার দিন কই? আজ তো সবাইর দিন। আপনার না?”
সে উত্তর দেয় না। চোখ তুলে রাস্তার দিকে তাকায়। নতুন জামা পরে ছেলেমেয়েরা হাঁটছে, কোথাও হাসি, কোথাও ছবি তোলা। সেইসব দৃশ্য তার কাছে কাঁচের ওপাশের মতো লাগে—দেখা যায়, ছোঁয়া যায় না।
রিকশাওয়ালা আবার বলল, "ঈদের দিনেও একা ঘুরতেছেন?”
এইবার সে একটু দেরি করে উত্তর দিল।
“একাই তো থাকি।”
কথাটা বলার পর নিজেই যেন অবাক হয়। এত সহজে কি বলা যায়—“একাই থাকি”?
রিকশাওয়ালা একটু চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে বলে,
“আমিও একা। গ্রামে বউ-বাচ্চা আছে, কিন্তু বছরেও দুইবার যাইতে পারি না। এই শহরে, আল্লাহ ছাড়া কেউ নাই।”
সে প্রথমবারের মতো মন দিয়ে শোনে।
“তাহলে আজ যান নাই কেন?”
“ভাড়া নাই ভাই,” লোকটা হেসে বলে। “ঈদের আগেই সব শেষ। আজ কামাই করলে কাল খাইতে পারমু।”
একটা হালকা বাতাস আসে, কিন্তু তাতে শীতলতা নেই। শুধু গরম হাওয়া।
সে একটু থেমে বলে, "আমি গেলে কি হতো জানেন? যে জায়গায় যেতাম, সেটা এখন আর আমার না।”
রিকশাওয়ালা কিছু বলে না। শুধু প্যাডেল চালায়।
তার মাথার ভেতর যেন পুরোনো কোনো সিনেমা চলছে। একটা মেয়ের হাসি, তার চোখ, তার কণ্ঠ—সবকিছু এত স্পষ্ট, যেন এখনো আছে। অথচ নেই। মেয়েটা চলে গেছে। অন্য একজনকে বিয়ে করেছে—যে হয়তো তার চেয়ে বেশি স্মার্ট, বেশি সফল, বেশি ‘যোগ্য’।
সে এসব নিয়ে ভাবতে চায় না। কিন্তু ঈদের দিনগুলো এমন—সব ভুলে থাকা যায় না।
হঠাৎ সে বলে ওঠে, "আপনি সুখী?”
রিকশাওয়ালা একটু চমকে যায়।
“কী জানি ভাই। সুখ কাকে কয়, বুঝি না। খাইতে পারলে ভালো লাগে, না পারলে খারাপ লাগে।”
সে একটু হাসে।
“আমার তো খাওয়ার সমস্যা নাই। তাও ভালো লাগে না।”
রিকশাওয়ালা এবার একটু পেছনে তাকায়।
“মনে লাগে না?”
সে মাথা নাড়ে।
“না।”
এই ‘না’ শব্দটা খুব ছোট, কিন্তু ভেতরে অনেক বড় শূন্যতা নিয়ে আসে।
তখনই আকাশটা একটু বদলাতে শুরু করে। গরম রোদের ফাঁকে কোথা থেকে যেন মেঘ জমে। শহরের ওপর একটা নরম ছায়া পড়ে।
রিকশাওয়ালা বলে, "মনে হয় বৃষ্টি আসবে।”
সে মাথা তুলে তাকায়। সত্যিই—আকাশ ধীরে ধীরে ঘন হয়ে আসছে।
কিছুক্ষণ পর প্রথম ফোঁটা পড়ে। তারপর আরেকটা। তারপর হঠাৎ করে, যেন কেউ দরজা খুলে দিয়েছে—বৃষ্টি নেমে আসে।
রিকশাওয়ালা তাড়াতাড়ি ছাউনিটা নামাতে যায়।
“ভাই, ভিজবেন না—”
সে হাত দিয়ে থামিয়ে দেয়।
“থাক… নামাবেন না।”
রিকশাওয়ালা একটু অবাক হয়, কিন্তু কিছু বলে না।
বৃষ্টি ততক্ষণে জোরে নেমে গেছে। তার গায়ে, মুখে, চুলে পানি পড়ছে। জামা ভিজে যাচ্ছে, চোখের পাতা ভিজে যাচ্ছে।
সে চোখ বন্ধ করে।
অনেকদিন পর তার মনে হয়—কিছু একটা অনুভব করছে। এই ভেজা, এই ঠান্ডা, এই শব্দ—সবকিছু মিলে এক ধরনের অদ্ভুত প্রশান্তি।
রিকশা ধীরে ধীরে এগোয়। চারপাশ ঝাপসা হয়ে যায় বৃষ্টির পর্দায়।
সে মনে মনে ভাবে—হয়তো এই বৃষ্টিটাই তার জন্য। এই শহরে, এই দিনে, তার জন্য আর কিছু না থাকলেও—এই কয়েক ফোঁটা পানি আছে।
রিকশাওয়ালা চুপচাপ চালিয়ে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে শুধু বলে, "ঠান্ডা লাগবে না তো ভাই?”
সে চোখ খুলে তাকায়। মৃদু হেসে বলে, "না… অনেকদিন পর ভালো লাগতেছে।”
বৃষ্টির ভেতর দিয়ে রিকশাটা এগিয়ে যায়—কোনো গন্তব্য ছাড়াই, কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই।
শহরের ভিড়, শব্দ, আলো—সবকিছু পেছনে পড়ে যায়।
শুধু এক যুবক, এক রিকশাওয়ালা, আর একটা হঠাৎ পাওয়া বৃষ্টি—এই তিনজন মিলে, অল্প সময়ের জন্য হলেও, এক ধরনের শান্তি খুঁজে পায়।
--