আমি এখন সত্যিই একা

আমার ঘরটা ছোট, কিন্তু ভেতরে ঢুকলে মনে হয় যেন একটা পুরোনো লাইব্রেরি। চারদিকে বই, সারি সারি তাক। কারও কাচ আছে, কারও আবার নেই। বইগুলোকে ঘিরে আমার জীবনের যতটা সময় গেছে, ততটা হয়তো কোনো মানুষের সঙ্গেও কাটেনি। অনেকেই বলে—বই মানুষকে সঙ্গ দেয়, বই নাকি নিঃসঙ্গতা ভাঙে। আমি বলি, দেয় তো বটেই, কিন্তু সবসময় নয়। রাত যত গভীর হয়, বইয়ের পাতাও তখন চুপ করে যায়। আমি যখন নিঃশ্বাস ফেলি, তখন কোনো পাতাও আমার সঙ্গে নিঃশ্বাস ফেলে না।
 
এই ঘরে আমি বহু বছর ধরে আছি। বাইরের পৃথিবী আমার কাছে শুধু জানালার ওপারে ভাঙাচোরা এক গলি। দিনের আলো খুব কম ঢোকে, বেশিরভাগ সময়েই ভারী হাওয়া, ধুলো আর এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। আমার অভ্যেস হয়ে গেছে। কিন্তু একাকীত্বের সঙ্গে অভ্যেস হয়নি কখনো।
 
একদিন হঠাৎ দেখি, বুকসেলফের নিচে কিছু একটা নড়ল। ছোট্ট এক বাদামি দাগ, এক লাফে অদৃশ্য হয়ে গেল। আমি বুঝতে পারলাম—একটা ইঁদুর। প্রথম দিন বিরক্ত হলাম। বুক ধড়ফড় করলও খানিকটা। মনে হলো, বইগুলো শেষ হয়ে যাবে, কাগজ কেটে ফেলবে, ঘরটা নোংরা করবে। অনেকক্ষণ বসে থাকলাম, কিন্তু আর বের হলো না।
 
তারপর থেকে প্রায়ই খেয়াল করতে লাগলাম। কখনো খটখট শব্দ, কখনো ছোট্ট কিঁক কিঁক। রাতে বাতি নিভিয়ে বসে থাকলে মনে হতো, ঘরের ভেতর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে ছোট্ট পা। প্রথম দিকে রাগ হতো, পরে সেই রাগ গলে গিয়ে কেমন যেন এক অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিল।
 
আমি ভেবেছিলাম, ইঁদুর মারার ওষুধ কিনব। অনেকেই পরামর্শ দিলো। একদিন সত্যিই দোকানে গিয়েছিলাম। ওষুধ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেই বুকের ভেতর কেমন অস্বস্তি হল। মনে হল, যদি সে মারা যায়, তবে এই ঘরে আমি আর একেবারেই একা হয়ে যাব। আমি বই বাঁচাতে পারব হয়তো, কিন্তু নিজেকে আর বাঁচাতে পারব না। তাই আর কিনিনি।
 
এরপর থেকে যেন একটা নীরব বোঝাপড়া তৈরি হল আমাদের মধ্যে। আমি খাওয়ার সময় একটু ভাত আলাদা করে রেখে দিই, হয়তো বিস্কুটের টুকরো। জানি, ও এসে খুঁজে নেবে। আমি ওকে কখনো কাছে ডাকিনি, ওও আমার কাছে আসেনি। তবু মনে হতো, আমরা একে অপরকে বুঝি।
 
রাতে ঘুম ভাঙলে অনেক সময় দেখি, ও আমার বিছানার পাশে বসে আছে। ছোট্ট চোখদুটো দিয়ে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে। আমি ধীরে ধীরে বলি, “তুই আছিস তো…” আর সে হঠাৎ ছুটে গিয়ে বুকসেলফের ফাঁকে লুকিয়ে পড়ে। কিন্তু বুকের ভেতর অদ্ভুত উষ্ণতা জমে যায়।
 
দিনগুলো বদলাতে লাগল। বাইরের পৃথিবীর মানুষজন আমাকে যতই ভুলে যাক, এই ছোট্ট প্রাণীটা যেন আমার জীবনে আলোর মতো ঢুকে পড়ল। আমি প্রতিদিন রাতে অপেক্ষা করি—কখন খটখট শব্দ শোনা যাবে। ওর ছোট্ট দৌড় আমার নিঃসঙ্গতা ভেঙে দেয়। অনেকটা প্রেমের মতোই। হয়তো ও আমাকে ভালোবাসে না, আমি জানি না ও কী ভাবে। কিন্তু আমি জানি, ও থাকলেই আমি একটু শান্তি পাই।
 
তবু ভয় হতো। যদি একদিন আর না আসে? যদি কোথাও মারা যায়? এই শহরে কত মানুষ আছে, তাদের কেউই আমার জন্য ভাবে না। অথচ একটা ছোট্ট প্রাণী, যাকে আমি কখনো ছুঁইনি, সে আমার জীবনের এত বড় অংশ হয়ে গেছে যে ও ছাড়া আমি আমার দিন কল্পনাও করতে পারি না।
 
একদিন খাবার রেখে দিলাম। সকালে দেখি ছোঁয়াই হয়নি। বুকের ভেতর হুহু করে উঠল। সারা দিন অস্থির লাগল। রাতে বসে রইলাম, শব্দ পেলাম না। মনে হল, বুকের ভেতর থেকে যেন কেউ আমার শ্বাস কেড়ে নিয়েছে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর অবশেষে ছোট্ট খটখট শব্দ শোনা গেল। বুকের ভেতর আলো জ্বলে উঠল। মনে হল, আমি আবার বেঁচে গেলাম।
 
কিন্তু সেই ভয়ের দিনটা খুব দূরে ছিল না।
 
এক রাতে দেখি, আমার রেখে দেওয়া খাবারের পাশে ও চুপচাপ পড়ে আছে। নড়ছে না। ছোট্ট শরীরটা ঠান্ডা হয়ে গেছে। হয়তো অসুস্থ হয়েছিল, হয়তো তার সময় হয়ে গিয়েছিল। আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। বুকের ভেতর একেবারে ফাঁকা হয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে ছুঁতে পারলাম না। শুধু তাকিয়ে থাকলাম।
 
ঘরটা তখনো একই। বইগুলো একইরকম সাজানো, বাতাসও একইরকম ভারী। অথচ সবকিছু কেমন বদলে গেল। খটখট নেই, কিঁক কিঁক নেই। আছে শুধু নীরবতা।
 
আমি জানালার পাশে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। বুকের ভেতর জমে থাকা শূন্যতা বাইরে বেরোতে চাইল না। মনে হচ্ছিল, আমি যেন একদম ভিতর থেকে ভেঙে পড়ছি।
 
তারপর থেকে রাতে বসে থাকি। বই খুলি না। শুধু তাকিয়ে থাকি বুকসেলফের দিকে। মনে হয়, হয়তো হঠাৎ আবার বের হবে। ছোট্ট দৌড়ে ঘরটা ভরে দেবে। কিন্তু জানি, আর আসবে না।
 
এখন ঘরটা আগের মতোই আছে। বইগুলো নীরব, বাতাস ভারী, আলো ঢোকে জানালার ফাঁক দিয়ে। কিন্তু আমার সেই ছোট্ট সঙ্গীটা আর নেই।
 
আমি এখন সত্যিই একা।

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!