দেইর আল মদিনার পাথুরে ঢাল বেয়ে নেমে আসার পর আমার যাত্রাপথ গড়াল আরেক বিস্ময়কর অধ্যায়ের দিকে—নোবেলম্যানদের সমাধি।
এখানে রাজাদের নয়, বরং তাঁদের ছায়ায় থাকা প্রশাসক, পুরোহিত, জরিপকারী, জ্যোতির্বিদদের কবর। দেইর এল-মদিনা যেখানে শিল্পীদের নিঃশব্দ প্রতিচ্ছবি, নোবেলদের সমাধি সেখানে জনজীবনের একটি বাস্তব আয়না। আমার প্রথম গন্তব্য ছিল নাখতের সমাধি—TT52। প্রবেশপথ সরু, দেয়ালে কিছুটা ক্ষয় দেখা দিলেও ভেতরে পা রাখতেই মনে হলো আমি যেন রঙে আঁকা এক গানের মধ্যে প্রবেশ করেছি। নাখত ছিলেন আমুন মন্দিরের পুরোহিত এবং জ্যোতির্বিদ। তাঁর সমাধির দেয়ালজুড়ে যে চিত্রমালা, তা নিছক চিত্র নয়—বরং জীবনের ছন্দ। এক পাশে দেখা যায় নারীরা সিস্ত্রাম বাজিয়ে নাচছেন, উৎসবের আবহ। অন্য পাশে চাষাবাদ, নৌকা চালানো, প্রার্থনা। প্রতিটি রেখা, প্রতিটি রঙ বলছে—এই মানুষটি কেবল পুরোহিত ছিলেন না, ছিলেন জীবনের একজন শ্রদ্ধাভাজন গায়ক।
তবে সবচেয়ে চোখে লেগে থাকে একটি নিঃশব্দ সাথী—একটি বিড়াল। দেয়ালের কোণায় বসে থাকা এই বিড়াল যেন কেবল একটি প্রাণীর প্রতিচ্ছবি নয়, বরং বাস্তেত দেবীর ছায়া—মিশরের নারী ও গৃহদেবীর রূপ। তার সামনে মাছের টুকরো রাখা, সে চুপ করে পাহারা দিচ্ছে যেন। প্রাচীন মিশরে বিড়াল মানেই সুরক্ষা, কোমলতা আর আত্মার সঙ্গী। নাখতের সমাধিতে এই বিড়াল এক গভীর মানবিকতা এনে দেয়—এমন এক চিত্র যা দেবতাদের মাঝেও মানুষের সান্নিধ্যের গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়।
এরপর যাই মেন্নার সমাধিতে—TT69। প্রবেশে কোনো বাধা না থাকলেও, বুরিয়াল চেম্বারে ঢোকার মুখে বিনয়ের সঙ্গে জানিয়ে দেওয়া হয়—অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিষেধ। তবে তার আগেই যে দৃশ্যগুলি চোখের সামনে আসে, তা সত্যিই অতুলনীয়। মেন্না ছিলেন ভূমি জরিপ ও রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা।
দেয়ালে দেখা যায় জমি মাপা হচ্ছে, রশি দিয়ে ক্ষেত পরিমাপ, শস্য কাটা এবং কর হিসেব—এ এক প্রশাসনিক মহাকাব্য যেন। তবে এর মাঝেও রয়েছে ভালোবাসা, স্ত্রীর সঙ্গে পারলৌকিক জীবনে যাত্রা, দেবতা ওসিরিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক দম্পতির ছবি—যেখানে কেবল কর্তব্য নয়, আছে বিশ্বাস ও আশ্বাস।
এই দুই সমাধিই জীবনের এমন চিত্র আঁকে যা রাজাদের কবরেও দেখা যায় না। একদিকে আছে শাস্ত্রীয় দায়িত্ব, অন্যদিকে আছে গৃহজীবনের কোমল চিত্র। এখানে মৃত্যু মানে শেষ নয়—বরং নতুন এক জীবন শুরু। দেইর আল মদিনা আমাকে শিল্পীদের চোখে স্বপ্ন দেখিয়েছে, আর নাখত ও মেন্নার সমাধি আমাকে দেখিয়েছে, কীভাবে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রঙ হয়ে দেয়ালে উঠে আসে। একজন জ্যোতির্বিদ আর এক রাজস্ব কর্মকর্তা—দুজনেই তাঁদের জীবন ও প্রেমকে পাথরের গায়ে অমর করে রেখে গেছেন। এই সমাধিগুলো আজও ফিসফিস করে বলে, “আমরা রাজা নই, তবে সময়ের কণ্ঠস্বর।”
