বইয়ের মলাটে অপেক্ষার গল্প

দুটি বইয়ের মলাট এখনও সদ্যছাপার গন্ধ ধরে রেখেছে। ২০১৯ সালের বইমেলার স্টলে সাজানো ছিল "ভ্রষ্ট সময়ে নষ্ট গল্প" আর "পুনশ্চ: ক্যামেরা এবং একটি সম্পর্কের গল্প"—মুঠোভরা পাতায় যেন আটকে আছে অপ্রকাশিত হাহাকার। পাঠকের আঙুলের স্পর্শ পায়নি প্রথম মুদ্রণের কাগজগুলো। প্রশংসার শব্দগুলো বাতাসে মিশে গেছে, কিন্তু বইগুলো রয়ে গেছে আলমারির কোণায়, ধুলোয় ঢাকা সময়ের মতো।
 
মিশরের পিরামিড আর গ্রিক দেবতাদের জটিল নামগুলো তিন- পাঁচ মুদ্রণ পার করে ফেলেছে। পুরাণের পাতায় জমেছে পাঠকের ঘাম, গল্পের পাতায় জমে আছে নীরবতা। কিডনি বিক্রির হাইপ তুলে যারা কিনেছে মিথলজির বই, তাদের কেউ ফেরেনি এই ছোট গল্পের দোকানে। মনে হয়, মলাটের ভিতরে লুকানো গল্পগুলো কোনো অদেখা রেলস্টেশনে অপেক্ষা করছে—ট্রেন আসবে না জানি, তবু টিকিট কেটে বসে আছে।
 
"গল্পগুলো অসাধারণ!"—এই বাক্যটা বারবার শুনেছি। কিন্তু প্রশংসার ফুলঝুরি যখন বইয়ের মুদ্রণসংখ্যায় গিয়ে ঠেকে, তখন বোঝা যায়: সাহিত্যের বাজারে শব্দের ওজন নেই, আছে শুধু পৃষ্ঠার সংখ্যা আর প্রচ্ছদের চকচকে রঙ। যারা বলেছেন "লেখা ভালো হয়েছে", তারা ফিরে তাকাননি সেই বইগুলোর দিকে, যেগুলো এক কাপ চায়ের দামে বিক্রি হয়।
 
২০১৯ থেকে ২০২৫। বইমেলার স্টলে নতুন বইয়ের গন্ধ এলেও, আমার গল্পের বই দুটো এখনও সেই প্রথম মুদ্রণের গ্লানি ঘুচাতে পারেনি। মনে হয়, যেন সময় নিজেই ভ্রষ্ট হয়ে গেছে—একটি গল্পের বইয়ের জীবনকালের হিসাবে সাত বছর কোনো ব্যাপার নয়, কিন্তু লেখকের জীবনে এটা এক যুগান্তকারী যন্ত্রণা।
 
লিখে ফেলবো আরেকটি গল্প। পাতায় পাতায় লুকিয়ে রাখবো এই কষ্ট—যেখানে এক মধ্য বয়স্ক লেখক আমি আমার অপ্রকাশিত বইগুলোকে জিজ্ঞাসা করবো, "তোমাদের কি কখনও পাঠক মিলবে?" হয়তো আলমারির ধুলোয় জবাব আসবে: "আমরা তো জন্মেছি শব্দের জন্য, সংখ্যার জন্য নয়।"
 
হয়তো একদিন কোনো পথচারী এই দুটি বই খুঁজে পাবে, আর তখন ভ্রষ্ট সময় এবং পুনশ্চ: ক্যামেরার গল্পগুলো নতুন করে জেগে উঠবে—মুদ্রণের সংখ্যা নয়, শব্দের শ্বাসে।
 
📍একটি অদৃশ্য মুদ্রণের প্রতি, যার প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা আছে "এখনও অপেক্ষা জারি আছে"

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!