ব্যথার রাজ্যে আনন্দের খোঁজে

... এরপর চারপাশটা একটু ভালো করে দেখতে শুরু করলাম।
এইচডিইউ-তে থাকা প্রতিটি রোগী যেন এক একটা গল্প। বামপাশে থাকা ভারতীয় ভদ্রলোক মধ্যবয়সী। তার মুখে ক্লান্তির ছাপ। হাতে একটি বই, যার পাতা ওল্টানোর ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন না। তার চোখের দৃষ্টি কখনও বইয়ের পাতায়, কখনও শূন্যে। তার ভেতরে অস্থিরতার ছাপ স্পষ্ট।
ডানপাশে শুয়ে থাকা ভারতীয় মহিলার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। তিনি চোখ বন্ধ করে আছেন। তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল বলে মনে হলো। নার্সরা তার পাশে দাঁড়িয়ে অক্সিজেন লেভেল চেক করছিলেন। মহিলার চেহারায় অসহায়ত্বের এক স্থির ছাপ।
অন্যপাশের কর্নারে সোমালীয় ভদ্রলোক বসে আছেন। তার বয়স পঞ্চাশের বেশি হবে না। তার মুখে যেন এক অদ্ভুত মিশ্র অভিব্যক্তি—ভয়, ব্যাকুলতা আর কিছুটা নির্লিপ্ততা।
আমি তাদের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। রোগী হিসেবে এই পরিবেশ আমাকে নতুন এক উপলব্ধি এনে দিচ্ছিল।
সন্ধ্যার পরপরই হঠাৎ করে সোমালীয় ভদ্রলোক কথা বলতে শুরু করলেন। তার কথা যেন ঝড়ের বেগে বেরিয়ে আসছিল—এক মুহূর্তের জন্যও থামছিল না। আশপাশের প্রতিটি মানুষ থমকে গেল। তার কণ্ঠে ছিল এমন এক অস্থিরতা, যা নীরব এইচডিইউ-র পরিবেশে একটা অদ্ভুত চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করল।
কিন্তু তার ভাষা ছিল সকলের অজানা। কেউ কিছুই বুঝতে পারছিল না। নার্সরা তার পাশে দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছিলেন। ভদ্রলোকের কণ্ঠে এমন এক ধরনের আবেগ ছিল, যা ভাষার সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল।
"উনি কী বলছেন?" একজন নার্স ফিসফিস করে বললেন।
"সম্ভবত সোমালি ভাষায় কথা বলছেন," আরেকজন উত্তর দিলেন। "ইন্টারপ্রেটর ছাড়া কিছু করার নেই।"
ইন্টারপ্রেটরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলো। কিন্তু তিনি ফোন ধরলেন না। সময় যেন থমকে গেছে। নার্সরা মোবাইলে অনুবাদ অ্যাপ ব্যবহার করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তাতেও কোনো লাভ হলো না। ভদ্রলোক যা বলছিলেন, তা কোনো প্রযুক্তির সাহায্যে শনাক্ত করা সম্ভব হলো না।
এদিকে ভদ্রলোকের কথা থামছিল না। তার ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল, তিনি হয়তো সাহায্য চাইছেন। নার্সরা উদ্বিগ্ন হয়ে একে অপরের দিকে তাকালেন।
আমি নিজেকে থামাতে পারলাম না। নার্সদের বললাম, "আপনারা কি তার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেছেন? তিনি হয়তো শারীরিক কষ্টের কথা বোঝানোর চেষ্টা করছেন।"
নার্সদের একজন ক্লান্ত গলায় বললেন, "আমরা চেষ্টা করছি। কিন্তু উনি যদি না থামেন, তাহলে কীভাবে তার কথা বুঝব?"
এদিকে বামপাশে বসা ভারতীয় ভদ্রলোক, যিনি এতক্ষণ নীরব ছিলেন, এবার মৃদু কণ্ঠে বললেন, "আমার মনে হয়, তিনি আপনাদের কোনো সমস্যার কথা জানাচ্ছেন না।"
নার্সরা বিস্মিত হয়ে তার দিকে তাকালেন।
"কোনো সমস্যার কথা জানাচ্ছেন না? কিন্তু এত অস্থিরভাবে?"
"হ্যাঁ," তিনি শান্ত কণ্ঠে বললেন। "তার কণ্ঠে আতঙ্কের চেয়ে কৃতজ্ঞতার ছাপ বেশি। আমি নিশ্চিত নই, তবে তার ভঙ্গি থেকে এটাই বোঝা যাচ্ছে।"
"আপনি কি ভাষাবিদ?" নার্সদের একজন জিজ্ঞেস করলেন।
"না," তিনি হেসে বললেন, "আমি একজন শিক্ষক। তবে মানুষের ভাষা আর অভিব্যক্তি নিয়ে কাজ করি।"
তার কথায় নার্সরা কিছুটা আশ্বস্ত হলেন। তবে ততক্ষণে ভদ্রলোকের কণ্ঠ আরও আবেগময় হয়ে উঠেছিল।
এদিকে ডানপাশে শুয়ে থাকা ভারতীয় মহিলার শ্বাসকষ্ট কিছুটা বেড়ে গিয়েছিল। নার্সরা দ্রুত তার পাশে চলে গেলেন। তিনি খুব ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, "আমি ঠিক আছি। ওদিকে যারা কথা বলছেন, তাদের প্রতি খেয়াল রাখুন।"
তার এমন অসুস্থ অবস্থায়ও অন্য রোগীর প্রতি সহানুভূতি দেখে নার্সরা বিস্মিত হলেন। তার চোখে ছিল এক ধরনের শান্তি, যা অন্যদের প্রতি গভীর মমত্ববোধ থেকে আসে।
আমি তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললাম, "আপনি খুব শক্ত মন নিয়ে লড়াই করছেন।"
তিনি চোখ মেলে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকালেন। তার ক্লান্ত চেহারায় ফুটে উঠল এক টুকরো হাসি। "সত্যি বলতে, জীবনে অনেক কিছু দেখেছি। আজ আর কিছুই আমাকে ভয় দেখায় না। তবে ভাষার সমস্যায় মানুষ আরও অসহায় হয়ে পড়ে।"
তার কথায় যেন আমার মন আরও ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। এইচডিইউ-র পরিবেশে একজন মহিলার এই অসাধারণ মানবিকতা আমাকে বিস্মিত করল।
প্রায় এক ঘণ্টা পর ইন্টারপ্রেটর ফোন ধরলেন। নার্সরা দ্রুত তার সঙ্গে পুরো বিষয়টি আলোচনা করলেন। ইন্টারপ্রেটর ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বললেন। ভদ্রলোকের কণ্ঠ যেন কিছুটা শান্ত হয়ে এলো।
ইন্টারপ্রেটর শেষে নার্সদের বললেন, "তিনি আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছিলেন।"
"ধন্যবাদ?" নার্সরা বিস্মিত হয়ে বললেন। "তিনি এতক্ষণ ধরে শুধু ধন্যবাদ জানাচ্ছিলেন?"
"হ্যাঁ," ইন্টারপ্রেটর বললেন। "তিনি বলছেন, আপনাদের যত্ন আর সহায়তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। তিনি সেটা বোঝানোর চেষ্টা করছিলেন।"
নার্সরা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এতক্ষণ ধরে তারা যার কথা বুঝতে পারছিলেন না, বিরক্ত হচ্ছিলেন, সেই মানুষটি কেবল কৃতজ্ঞতার অনুভূতি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন।
⭕ "ব্যথার রাজ্যে আনন্দের খোঁজে" মানবিকতার একটি বই, মানুষকে জানার একটি বই। পাওয়া যাচ্ছে বিবলিওফাইল প্রকাশনীর স্টলে, স্টল নাম্বার ৬১১-৬১২। ছবিটি আমার তোলা।
 

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!