ভোরবেলার বাতাসে মেমননের কান্না

ভোরবেলার বাতাসে মেমননের কান্না
-------------------------------
আসোয়ানের মরূভূমি পেরিয়ে আমরা যখন লুক্সোরের দিকে এগোচ্ছি, তখন রাস্তার দু’ধারে খেজুর গাছের ছায়া আর ধূসর ধূলির ফাঁকে ভেসে ওঠে দুই প্রাচীন পাথরের মূর্তি— কোলোসি অব মেমনন। এতদিন বইয়ে ছবি দেখেছি, ডকুমেন্টারিতে দেখেছি, কিন্তু এই প্রথম সামনে দাঁড়িয়ে। মূর্তিদুটো যেন বিশাল পাথরের পাহাড়, যাদের গায়ে সময় খোদাই করে গেছে নিজের ইতিহাস।
কিন্তু গাইড হঠাৎ বললেন, “এই জায়গার নাম মেমনন - তুমি জানো, ওটা গ্রিক মিথলজির মেমনন?"
আমি অবাক হলাম। ফারাও আমেনহোটেপের মূর্তি হয়ে কীভাবে গ্রিক বীর মেমনন হয়ে গেল?
তাহলে উত্তর খুঁজতে হয় ইতিহাসের পাতায়।
 
প্রথমেই জানা দরকার, এই মূর্তিগুলি খ্রিস্টপূর্ব ১৪শ শতকে গড়া—ফারাও আমেনহোটেপ তৃতীয়-এর অপূর্ব স্মারক। তাঁর সম্মানে গড়ে তোলা হয়েছিল এক মহা-মন্দির, যার ভগ্নাংশ শুধু এই দুটি মূর্তিতেই আজ টিকে আছে। এই মূর্তিগুলি রোমান যুগেও দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ২৭ সালের এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে উত্তরদিকের মূর্তিটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তারপরই শুরু হয় সেই কাহিনি—ভোরের সময়, সূর্য ওঠার আগে, মূর্তিটির ভিতর থেকে একধরনের ‘বীভৎস অথচ মৃদু শব্দ’ বের হতে লাগল।
 
রোমান ও গ্রিক পর্যটকেরা তখন এই অঞ্চলে ঘুরতে আসতেন। তাদের অনেকেই লিখে গেছেন—এই আওয়াজ নাকি দেবতাদের কণ্ঠস্বর, কেউ বলেছে এটা কোনো আত্মার আর্তনাদ। এই রকমই একজন পর্যটক ছিলেন গ্রিক ঐতিহাসিক ও ভ্রমণকারী পসানিয়াস। তিনি মনে করেছিলেন, এই মূর্তি হচ্ছে সেই মেমনন, যিনি গ্রিক পুরাণে ইথিওপিয়ার রাজপুত্র এবং ট্রয়ের যুদ্ধের এক বীর যোদ্ধা। তাঁর মা ছিল ভোরের দেবী ইওস (Eos), আর মেমনন নিজে সূর্যের সন্তান—ট্রয়ের যুদ্ধে অ্যাকিলিসের হাতে নিহত হন।
 
এই “সকালের কান্না” শুনে রোমান ও গ্রিকদের মনে হয়েছিল, ভোরের দেবী নিজের মৃত পুত্র মেমননকে আহ্বান করছেন, আর এই আওয়াজ তাঁর প্রতিক্রিয়া—এক রূপকথার প্রতিধ্বনি।
তবে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও রয়েছে।
 
গ্রীষ্মকালে, যখন সূর্য ওঠার সময় দ্রুত তাপমাত্রা বাড়ে, তখন ভোরবেলায় ঠান্ডা পাথরের ভেতর জমে থাকা আর্দ্রতা ও বায়ু হঠাৎ বিস্তার লাভ করে—এই কারণেই হয়তো ক্ষতিগ্রস্ত মূর্তির ফাটলে হাওয়ার চাপ পড়ে শব্দ তৈরি হতো। রোমান সম্রাট সেপ্টিমিয়াস সেভেরাস পরে এই মূর্তিটি সংস্কার করেন, আর তখন থেকেই শব্দটি আর শোনা যায় না।
 
তবু নাম থেকে যায়—মেমনন।
 
আজ যখন আমি সেই দুই মূর্তির নিচে দাঁড়িয়ে আছি, আমার মনে হলো—মিশরের মরুপ্রান্তে দাঁড়িয়ে এক গ্রিক পুরাণের চরিত্র কীভাবে নিজের স্থান করে নিলো! এই ‘কালচারের কোলিশন’ আসলে প্রমাণ করে দেয়, মিশর ছিল শুধু এক দেশের ইতিহাস নয়, বরং এক বৈশ্বিক সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু—যেখানে গ্রিক, রোমান, মিশরীয়—সব সভ্যতার চিন্তা এসে মিলেছে।
 
কলোসি অব মেমনন কোনো একক কল্পনার স্মারক নয়—এটা সময়ের ফাটলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা ইতিহাস, যেখানে সূর্য ওঠে প্রাচীন মিশরের, আর তার ছায়া পড়ে গ্রিক পুরাণের এক সন্তানের ওপর।
আর আমি? আমি দাঁড়িয়ে আছি সেই ছায়ায়, যেন শুনতে পাচ্ছি—ভোরবেলায় আবারও কোথাও এক অতীতকালের শব্দ মৃদু করে ডাকছে—“আমি মেমনন… ফিরে এসো!”
 
This writing is dedicated to my dear HoSO Jeorge Martinez...
 
 

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!