মাকিয়াভেলির The Prince

মাকিয়াভেলির The Prince

মাকিয়াভেলির The Prince
-----------------------------
দুইদিন আগে মেডিচি এবং মাকিয়াভেলি নিয়ে কিছুটা বলেছিলাম। সেদিন শেষ করেছিলাম the prince এর লেখা শুরু মানে কনসিভ করা পর্যন্ত। আজকের পর্বে আছে এর জন্ম থেকে শুরু করে অবশিষ্ট কাহিনি-
 
মাকিয়াভেলি মারা যান ১৫২৭ সালে—নিঃশব্দে, প্রায় অবহেলিত অবস্থায়। তাঁর শেষ দিনগুলো কেটেছিল অসুস্থতা, হতাশা আর এই বোধ নিয়ে যে তিনি জীবনে আর কখনো ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরতে পারবেন না।
The Prince তখনো কোনো বই নয়; সেটা ছিল কিছু অধ্যায়ে ভাগ করা একটি পান্ডুলিপি, হাতে লেখা কাগজের স্তূপ, যেটা তিনি কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে দেখিয়েছিলেন, মেডিচি পরিবারের দরবারে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু যেটার ভাগ্য কী হবে—তা তিনি নিজেও জানতেন না। মৃত্যুর সময় বইটি প্রকাশিত হবে, এই বিশ্বাসও তাঁর ছিল না।
মাকিয়াভেলির মৃত্যুর পর তাঁর লেখাগুলোর ভার এসে পড়ে তাঁর বন্ধু ও ঘনিষ্ঠ বুদ্ধিবৃত্তিক মহলের হাতে। বিশেষ করে ফ্লোরেন্সের মানবতাবাদী বৃত্তে তাঁর নাম তখনো পরিচিত—একজন তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক, সাবেক কূটনীতিক, কিছুটা বিপজ্জনক চিন্তাবিদ হিসেবে। এই মহলের মধ্যেই ছিলেন ইতিহাসবিদ ফ্রানচেস্কো গুইচিয়ার্দিনি এবং মাকিয়াভেলির পরিবারের সদস্যরা। তারাই ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত নেন—এই লেখাগুলো আর লুকিয়ে রাখা যাবে না।
সময়টা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ইতালিতে তখন ক্ষমতার পালাবদল, যুদ্ধ, বিদেশি হস্তক্ষেপ—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক বাস্তবতা আরও নির্মম হয়ে উঠছিল। The Prince যেন হঠাৎ করেই সময়োপযোগী হয়ে উঠল।
 
১৫৩২ সালে রোমে বইটি প্রথম ছাপা হয়। কে ছেপেছিল—এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বইটি ছেপেছিল এক ভ্যাটিকান-অনুমোদিত প্রিন্টার। অর্থাৎ শুরুতে গির্জা বইটাকে বিপজ্জনক মনে করেনি, বা অন্তত পুরোটা পড়ে ওঠার আগেই ছাপার অনুমতি দিয়ে ফেলেছিল। ছাপার সময় বইটির সঙ্গে মাকিয়াভেলির নাম যুক্ত করা হয়, কিন্তু কোনো বড় ভূমিকাবক্তব্য বা সতর্কবার্তা ছিল না। বইটি যেন নিরীহ একটি রাজনৈতিক প্রবন্ধ হিসেবেই বাজারে এল। এখানেই গির্জার প্রথম বড় ভুল।
 
কিন্তু বইটি ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশি সময় লাগেনি। রোম, ফ্লোরেন্স, ভেনিস—ইতালির বুদ্ধিজীবী মহলে বইটি দ্রুত আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। রাজদরবারের লোকেরা পড়তে শুরু করে আগ্রহ নিয়ে। কারণ এখানে এমন কিছু বলা হচ্ছিল, যা তারা প্রতিদিন করছিল, কিন্তু কেউ লিখে রাখেনি। বইটি পড়ে অনেকেই আতঙ্কিত হলো, আবার অনেকেই নিঃশব্দে মাথা নাড়ল—হ্যাঁ, এটাই সত্যি।
 
এই আলোচনাই গির্জার কানে পৌঁছাতে শুরু করে। ধর্মতাত্ত্বিকেরা বইটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলেন, আর তখনই সমস্যা স্পষ্ট হলো। এখানে রাজনীতিকে সম্পূর্ণভাবে নৈতিকতা থেকে আলাদা করা হয়েছে। ঈশ্বর এখানে শাসনের উৎস নন। শাসকের সাফল্য এখানে ঈশ্বরের আশীর্বাদের ফল নয়, বরং কৌশল, ভয়, প্রতারণা আর শক্তির হিসাব। এই দৃষ্টিভঙ্গি গির্জার জন্য শুধু অস্বস্তিকর নয়, বিপজ্জনক। কারণ গির্জার ক্ষমতার ভিত্তিই ছিল এই ধারণা—শাসক ঈশ্বরের প্রতিনিধি।
 
১৫৪০-এর দশক থেকেই ধর্মযাজকেরা প্রকাশ্যে মাকিয়াভেলির বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেন। তাঁর নামের সঙ্গে “শয়তান”, “অধর্ম”, “নৈতিক পচন”—এই শব্দগুলো জুড়ে যেতে থাকে। নাটকে, উপদেশে, ধর্মীয় বক্তৃতায় “মাকিয়াভেলিয়ান” শব্দটা এক ধরনের অভিশাপ হয়ে ওঠে। মানুষকে সতর্ক করা হয়—এই বই পড়লে আত্মা নষ্ট হবে, রাজারা অত্যাচারী হয়ে উঠবে, সমাজ ঈশ্বরহীন হয়ে পড়বে।
 
শেষ পর্যন্ত ১৫৫৯ সালে ভ্যাটিকান চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। পোপ পল চতুর্থের নির্দেশে তৈরি হয় Index Librorum Prohibitorum—নিষিদ্ধ বইয়ের তালিকা। এই তালিকায় একসঙ্গে মাকিয়াভেলির সব লেখা রাখা হয়, শুধু The Prince নয়। কারণ গির্জা বুঝেছিল—সমস্যা শুধু একটি বই নয়, পুরো চিন্তাধারা। এই নিষেধাজ্ঞা ছিল কঠোর। ক্যাথলিকদের জন্য এই বই পড়া পাপ, রাখা অপরাধ, ছাপানো শাস্তিযোগ্য।
 
গির্জা ভেবেছিল এতে বইটি হারিয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটল উল্টোটা। নিষিদ্ধ হওয়ার পর বইটির প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে গেল। কারণ নিষেধাজ্ঞা নিজেই একটি বার্তা দেয়—এই বইয়ে কিছু আছে, যা ক্ষমতাকে নাড়িয়ে দিতে পারে। রাজারা প্রকাশ্যে গির্জার সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন, কিন্তু গোপনে বইটি সংগ্রহ করতে শুরু করলেন। অনেক ক্ষেত্রে বইটির নাম বদলে রাখা হলো, অনেক ক্ষেত্রে হাতে লেখা কপি ঘুরতে লাগল। লাইব্রেরির প্রকাশ্য তাক থেকে বইটি সরে গেল, কিন্তু ব্যক্তিগত ঘরের ড্রয়ারে ঢুকে পড়ল।
 
ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড—সব রাজদরবারেই একই চিত্র। উপদেষ্টারা প্রকাশ্যে নৈতিকতার কথা বলেন, কিন্তু নীতিনির্ধারণের সময় মাকিয়াভেলির যুক্তি ব্যবহার করেন। কেউ স্বীকার করেন না, কিন্তু সবাই জানে—এই বই রাজনীতি বুঝতে সাহায্য করে। এটাই গির্জার সবচেয়ে বড় পরাজয় ছিল। তারা বইটাকে নিষিদ্ধ করতে পেরেছিল, কিন্তু চিন্তাটাকে থামাতে পারেনি।
সময় গড়াতে থাকে। ইউরোপে ধর্মযুদ্ধ, রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তন, আধুনিক রাষ্ট্রের জন্ম—এই সব কিছুর সঙ্গে সঙ্গে The Prince আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। ১৭শ ও ১৮শ শতকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বইটি আলোচনা হতে শুরু করে—কখনো সমালোচনার জন্য, কখনো বিশ্লেষণের জন্য। নিষেধাজ্ঞা তখনো কাগজে ছিল, কিন্তু বাস্তবে আর কার্যকর ছিল না।
শেষ পর্যন্ত ১৯৬৬ সালে ভ্যাটিকান আনুষ্ঠানিকভাবে Index of Forbidden Books বাতিল করে। তার সঙ্গে সঙ্গে The Prince–এর ওপর নিষেধাজ্ঞাও উঠে যায়। কিন্তু তখন আর কিছু বদলানোর ছিল না। বইটি তখন ইতিহাসের অংশ, রাজনীতির পাঠ্য, আর ক্ষমতার ভাষার অবিচ্ছেদ্য উপাদান।
 
এইভাবেই এক নির্বাসিত মানুষের লেখা বই—যা প্রথমে প্রায় অযত্নে ছাপা হয়েছিল, পরে শয়তানের নামে নিষিদ্ধ হয়েছিল—ধীরে ধীরে ইউরোপের প্রতিটি সিংহাসনের ছায়ায় জায়গা করে নেয়। আলোতে নয়, ঘোষণায় নয়, বরং নীরব ব্যবহারে। ঠিক যেভাবে ক্ষমতা নিজেও কাজ করে—চুপচাপ, কিন্তু গভীরভাবে।
 
 

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!