রাত ধীরে ধীরে নিজের শরীর খুলে দিচ্ছিল। আলো–ছায়ার ফাঁক দিয়ে শহরটাকে সে যেন নিঃশব্দে গিলে নিচ্ছিল। রাস্তায় গাড়ির শব্দ কমে এসেছে অনেকক্ষণ, মানুষের কোলাহল থমকে দাঁড়িয়েছে, আর বহুতলের জানালায় একে একে নিভে গেছে ক্লান্ত আলো। সেই ক্ষণেই প্রথম টের পেলাম—রাতের নিজের একটা গন্ধ আছে।
এই গন্ধ মাদকতার, যেন ছায়ার ভেতর নরম হাতে টেনে নেওয়া হয়। এই গন্ধ মোহনীয়তার, যেন সমস্ত শহরই নীরব জাদুমন্ত্রে আবৃত। এই গন্ধ একাকীত্বের, যেন শূন্য ঘরে কেউ নিঃশ্বাস ফেলে যায়। এই গন্ধ নির্জনতায় ভেজা, যেন দূরের কোনো অচিন নদী নিশব্দে বয়ে চলেছে। এই গন্ধ শুনশান নীরবতার, কানে কানে বলে—এ পৃথিবীতে আসলে তুমি একাই। আর সবচেয়ে বেশি—প্রিয় মানুষটাকে কাছে পাওয়ার জন্য একটা গভীর আকুলতার।
এতোদিন কেন যে বুঝিনি!
রাতের এই গন্ধ তো আমার চারপাশেই ছিল, শুধু আমার ভেতরে দরজাটা খোলা ছিল না।
যত রাত বাড়ে, শহরের আলো যত নিভে আসে, রাতের গন্ধও তত তীব্র হয়।
মনে হয়—অন্ধকারও যেন নিঃশ্বাস নিচ্ছে।
আমি অনুভব করি সেই নিশ্বাসের স্পন্দন, আর অদ্ভুত এক টান আমাকে ফোনের পর্দায় ঠেলে দেয়।
আমি ফোন করি তাকে।
অন্যপ্রান্তে একের পর এক রিং বেজে যায়—
দীর্ঘ, দীর্ঘ, অনন্ত।
ফোন তোলে না কেউ।
আর ঠিক সেই সময়েই রাতের গন্ধ আরও গাঢ় হয়ে ওঠে—
এমন এক গন্ধ, যা অপেক্ষাকে আরও দীর্ঘ করে,
আর হৃদয়ের ভেতরে জমতে থাকা আকুলতাকে
ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে, গভীর করে তোলে।
অপেক্ষার শেষ নেই—
কারণ রাতের গন্ধ থামে না কখনো।