পুরাণের সমান্তরালে

পুরাণের সমান্তরালে

📕 পুরাণের সমান্তরালে....
 
... ... ... ... তিনি ঈগলের ছদ্মবেশে প্রমিথিউসের সামনে এসে দাঁড়ালেন। প্রমিথিউস ঈগলকে দেখেই বুঝতে পেরেছিলেন, এটি আর কেউ নয়, স্বয়ং জিউস! প্রমিথিউস নিরব থাকলেন। জিউস ঈগল থেকে তার আসল চেহারায় এসে প্রমিথিউসের চোখে চোখ রাখলেন। প্রথমবারের মতো তার মনে হল, তিনি কি ভুল করছেন? প্রমিথিউস তার প্রাণের বন্ধু ছিলেন। কত স্মৃতি যে হঠাৎ করে চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো। টাইটান হয়েও প্রমিথিউস যুদ্ধে জিউসকে সাহায্য করেছিলেন। প্রমিথিউসের প্রতি জিউসের এতোই ভরসা ছিল যে, মানুষ সৃষ্টির মহান দায়িত্বও তিনি প্রমিথিউসকেই দিয়েছিলেন। জিউস কি একটু টলে উঠেছিলেন?
তিনিই প্রথম কথা বলা শুরু করলেন, ‘আমার বন্ধু প্রমি! আমাকে ক্ষমা করো। তোমাকে আমার এখন শাস্তি দিতেই হবে। তা না হলে অলিম্পাসে আমার রাজত্ব টিকিয়ে রাখা খুব কঠিন হয়ে যাবে’।
‘আমি আপনাকে বাধা দেইনি, তাই না?’ জবাব দিলেন প্রমিথিউস। তার হৃৎপিণ্ডের ধুক ধুক শব্দও যেন শোনা যাচ্ছিলো। মানুষের জন্য আগুন নিয়ে আসার পর এই প্রথমবারের মতো জিউসের সাথে তিনি কথা বলছিলেন।
‘তাহলে চলো’।
 
দু’জন পাশাপাশি হাঁটতে লাগলেন। জিউসের মন খুব উথাল পাতাল হয়ে উঠছিল। তার কাছে বারবার মনে হচ্ছিল, পুরানো বন্ধুকে বুকে জড়িয়ে ধরে। প্তমিথিউস যদি একটিবার ক্ষমা চায়, তাহলে তিনি সাথে সাথে মাফ করে দিবেন। একসময় নিরবতা ভেঙ্গে বলেই ফেললেন, ‘প্রমি, শুধু একবার বল, মানুষকে আগুন দিয়ে তুমি ভুল করেছ!’
‘আমি মানুষকে আগুন দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসকেই পরিবর্তন করেছি। আমি এমন এক জাতিকে সৃষ্টি করেছি এবং তারা এখন এমন পর্যায়ে এসেছে, আমি জানি তারা ভবিষ্যতে দেবতাদের সাহায্য ছাড়াই চলতে পারবে। তারা মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকবে। আর এজন্য যুগ যুগ ধরে তারা আপনার নাম নয়, আমার নামই শ্রদ্ধাভরে উচ্চারণ করবে’।
প্রমিথিউসের কথা শুনে জিউসের মনে যেটুকু মায়া ছিল, তা নিমিষেই উবে গেল। তিনি গর্জে উঠলেন, ‘তবে কঠিন শাস্তির জন্যই তুমি প্রস্তুত হও’।
একসময় তারা এসে পৌঁছালেন ককেশাস পাহাড়। অনেক উঁচু এক পাহাড়। প্রমিথিউস দেখতে পেলেন, তিনজন সাইক্লোপ আগে থেকেই সেখানে আছে। এই সাইক্লোপ এক অদ্ভুত প্রাণী। বলা হয়ে থাকে, এরা না কি অউরানোসের সন্তান ছিলেন। কিন্তু চেহারা কিম্ভুতকিমাকার এবং কপালের মাঝখানে চোখ থাকায় পৃথিবীর ভিতরে কোনো এক জায়গায় এদেরকে বন্দি করে রেখেছিলেন। জিউস এদেরকে উদ্ধার করেছিলেন নিজের স্বার্থেই। টাইটান যুদ্ধে এরা জিউসের পক্ষে বিপুল ভূমিকা রেখেছিলেন।
 
তিনজন সাইক্লোপ পাহাড়ের চূড়ার দিকে একটা দিক ছেঁচে সমান করে রেখেছিল। জিউস বললেন, ‘তুমি পাহাড় বেয়ে সেখানে উঠে যাও। আমি জানি, তুমি খুব ভালো পাহাড় বাইতে পারো’। প্রমিথিউস একবার জিউসের দিকে তাকিয়ে চূড়ায় উঠতে গেলেন। পরক্ষণেই থেমে ঘুরে জিউসকে বললেন, ‘আমার একটা অনুরোধ আছে। আমার সাথে কুয়েটজালকোয়াটল বসবাস করতো। আমার ইচ্ছে ছিল, যেভাবেই হোক ওকে ওর পৃথিবীতে পাঠাবো। সম্ভব হয়নি। আপনি এই কাজটা করে দিয়েন’।
 
হো হো করে হাসলেন জিউস, ‘ওকে নিয়ে আমার পরিকল্পনা আছে, ও না মানুষকে কৃষিকাজ শিখিয়েছিল?’ কিছুটা আঁতকে উঠলেন প্রমিথিউস। ‘ও নিজে থেকে কিছু করেনি, আমিই ওকে সবসময় জোর করেছি’, আর্তনাদ করে উঠলেন প্রমিথিউস।
 
‘প্রমি, ভয় নেই। আমি ওকে…’ কথাটা আর শেষ করলেন না!
পাহাড় চূড়ায় গিয়ে প্রমিথিউস দেখলেন সেখানে হেফাস্টাস দাঁড়িয়ে আছে, ‘বন্ধু, আমাকে ক্ষমা করো। আমার কিছুই করার ছিল না। আশা করি, তুমি বুঝতে পারছ সবকিছুই’। প্রমিথিউস হেফাস্টাসকে জড়িয়ে ধরলেন, ‘না না। কী যে বল তুমি! আমি তোমাকে তোমার সেই পিচ্চিকাল থেকে চিনি। চিন্তা করো না। শুধু একটা অনুরোধ রইলো, কুয়েটজালকোয়াটলকে দেখে রেখে’।
সেই পাহাড় চূড়ায় হেফাস্টাস জিউসের আদেশে প্রমিথিউসকে শিকল দিয়ে বাঁধলেন। তার মাথার উপরে দেখা গেলো দু’টি ঈগল এসে বারে বারে উড়ে যাচ্ছে। নীচ থেকে জিউস চিৎকার দিয়ে বলে উঠলেন, ‘প্রমি, এই ঈগল দু’টো তোমাকে প্রতিদিন ঠুকরে ঠুকরে খাবে। কিন্তু তুমি যেহেতু অমর, তাই পরের দিনই তোমার ক্ষত ঠিক হয়ে যাবে। এভাবে অনন্তকাল চলবে। তুমি কখনই এখান থেকে মুক্তি পাবে না’।
প্রমিথিউস হেসে দিলেন। হাসতে হাসতেই তাচ্ছ্বিল্যের স্বরে বললেন, ‘একদিন আমার কাছে আপনি আসবেন। আমি জানি। আমি আরো অনেক কিছু জানি’। বজ্র গম্ভীর কন্ঠে জিউস জানতে চাইলেন, ‘কী জানো তুমি?’
‘আপনাকে তা বলবো না!’
 
জিউস চিৎকার করে উঠলেন। ‘হতচ্ছাড়া! তুমি আসলে ঈগলের ঠোকর খাওয়ার যোগ্য নও। তোমাকে প্রতিদিন ঠোকরাবে শকুন’। মুহূর্তের মধ্যে ঈগল দু’টি কুৎসিত শকুনে পরিণত হয়ে গেলো। এই দু’টি শকুন তাদের ক্ষুর- তীক্ষ্ম নখ দিয়ে টাইটান প্রমিথিউসের শরীরের এক পাশ থেকে থাবলা দিয়ে মাংস খুলে নেওয়া শুরু করলো আর বিজয়ের ভয়ঙ্কর চিৎকার দিয়ে সেই মাংস খাওয়া শুরু করলো।
প্রমিথিউস, মানবজাতির স্রষ্টা, বন্ধু, যিনি মানুষদের শিখিয়েছেন, মানুষদের জন্যই নিজেকে উৎসর্গ করে দিলেন। তিনিই ছিলেন মানুষদের কাছে উপাসনা করার সবচেয়ে যোগ্য দাবিদার, অথচ তিনি কোনোদিন ঈর্ষান্বিত দেবতাদের মতো মানুষের কাছ থেকে পূজা দাবি করেননি।... ... ... ...
 
(২০২৪ সালে আজব প্রকাশ থেকে প্রকাশিত)
 
ছবিতে আছে: ফারহানা লিজা

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!