সালাহউদ্দিনের দুর্গ

কায়রো শহরের বুক চিরে উঠে দাঁড়িয়েছে ইতিহাসের এক অমর সাক্ষী—সালাহউদ্দিনের দুর্গ।

দূর থেকে দেখলেই মনে হয়, যেন প্রাচীন কোনো রূপকথার রাজ্য। মুকাত্তাম পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা এই দুর্গ শুধু একখণ্ড পাথরের গাঁথুনি নয়, বরং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মিশরের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।দুর্গের প্রবেশপথে পা রাখতেই মনে হয়, সময় যেন পেছনের দিকে ছুটছে। মোটা পাথরের দেয়াল, সুউচ্চ প্রাচীর আর বিশালাকায় টাওয়ার—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত নিরাপত্তা আর শক্তির অনুভূতি।

সালাহউদ্দিন এই দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন ক্রুসেডারদের আক্রমণ থেকে কায়রো শহরকে রক্ষা করার জন্য। তার দূরদর্শিতায় গড়ে ওঠা এই দুর্গ পরবর্তীতে মিশরের শাসকদের আবাসস্থল ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে।দুর্গের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে মোহাম্মদ আলী মসজিদ। দূর থেকেই মসজিদের সাদা গম্বুজ আর সুউচ্চ মিনার নজর কাড়ে। ভেতরে প্রবেশ করলে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয় তার অপূর্ব কারুকাজ আর বিশাল প্রাঙ্গণ দেখে। অটোমান স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মসজিদ যেন এক অনন্য সৌন্দর্যের প্রতীক। এখানে দাঁড়িয়ে কায়রো শহরকে দেখে মনে হয়, পুরো শহরটাই যেন হাতের মুঠোয়।

দুর্গের আরেকটি গর্ব—সুলতান আল-নাসির মুহাম্মদের মসজিদ। সবুজ টাইলসের গম্বুজ আর মমলুক স্থাপত্যের ছোঁয়া নিয়ে এই মসজিদ যেন ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। শত শত বছর ধরে এখানে ধ্বনিত হয়েছে আজানের সুর, আর মিশরের শাসকরা এখানে এসে খুঁজে পেয়েছেন আত্মার প্রশান্তি।দুর্গের অলিগলি ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে মনে হয়, প্রতিটি ইট যেন গল্প বলে। কোথাও রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষ, কোথাও আবার সামরিক জাদুঘর, কোথাও পুলিশের ইতিহাসের নিদর্শন। দুর্গের এক কোণে রয়েছে বিখ্যাত ইউসুফ কূপ—যে কূপের গভীরতা আজও বিস্ময় জাগায়।

শেষ বিকেলের আলোয় যখন দুর্গের চূড়া থেকে কায়রো শহরকে দেখি, মনে হয়—আমি যেন সময়ের স্রোতে ভেসে যাচ্ছি। সালাহউদ্দিনের দুর্গ ও তার মসজিদ শুধু স্থাপত্য নয়, এক জীবন্ত ইতিহাস, এক চিরন্তন ভ্রমণকাহিনি। এখানে এসে মিশরের অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ—সবকিছু একসূত্রে গাঁথা মনে হয়। ইতিহাস, সংস্কৃতি আর সৌন্দর্যের মেলবন্ধনে সালাহউদ্দিনের দুর্গ সত্যিই এক অনন্য গন্তব্য।

 

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!