অনিশ্চিত বিষাদের গন্ধ

 
দিনের শেষে রোদ্দুর যখন জানালার গ্রিলে আঙুল ফসকে যায়, তখনই মনটা যেন কাঠের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে অন্ধকার কোনো কুঠুরিতে। সারাদিনের হাসি-গল্প, বাজার-হাট, চায়ের কাপে চুমুক—সবকিছুই যেন একটা স্বপ্নের পর্দায় আটকে থাকে। হঠাৎ করেই সন্ধ্যার নীলচে আভায় মিশে যায় এক অদৃশ্য ভার, যেন কেউ হৃদয়ে ফেলে গেল এক মুঠো ছাই। কী সেই ছাই? হয়তো একাকীত্বের গুঁড়ো, কিংবা অভিমানের তপ্ত ধোঁয়া। মানুষ তো মরুভূমির মতো; বালির নিচে লুকিয়ে থাকে বিষাদের ঝর্না, কখন ফুটে উঠবে কে জানে!
---
সেইদিন বিকেলেও আকাশ ছিল লেবু রঙা। ফিসফিসিয়ে বৃষ্টি নামছিল, আর আমি বসে ছিলাম বারান্দার মোড়ার উপর। পাশের বাড়ির কাকাতুয়া ডাকছিল বারবার—"মনো...মনো..."। মনে হচ্ছিল, ওর ডাকেও কি অভিমান লুকোনো? মানুষ আর পাখির মাঝে তফাত কী! আমরা দুজনেই তো প্রিয় মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকি, আর যখন সাড়া পাই না, তখন চুপ করে আঁচল গুটিয়ে নিই। কিন্তু মানুষের অভিমান এত নিঃশব্দ কেন? যেন ভাঙা হারমোনিয়ামের সুর—কেউ শুনতে পায় না, কিন্তু বাতাসে কাঁপে।
---
মায়ার কথা মনে পড়ে। গত বছর ঈদের দিনে সে ফোন করেছিল, "দাদু, তুমি একা থাকো কেন? আমাদের এখানে চলে আসো।" আমি হেসেছিলাম, "তোর মা তো রাগ করবে।" মায়া জিদ ধরেছিল, "তুমি যদি না আসো, আমি চুল বেঁধে দেব না!" কৈ, সেই চুলের বিনুনি আজও অসম্পূর্ণ। আর আমার অভিমান? সেটা তো মায়ার ফোন না করা পর্যন্ত লুকিয়ে থাকবে পুরোনো আলমারির গহ্বরে, যেখানে জমে আছে তার ছোট্ট হাতের আঁকা জন্মদিনের কার্ড। অভিমান তো প্রেমেরই আরেক নাম—একটু না ব্যথা পেলে বোঝাই যায় না কতটা ভালোবাসা।
---
জীবন যে একটাই, এ কথা আমরা জানি। তবু কেন নিজের হাতে সময়ের ডালি ফুটো করে দিই? অভিমানের পাথর ছুঁড়ে মারি আয়নায়, আর তারপর খণ্ডিত চিত্র দেখে কেঁদে বলি—"এটা আমি নই!" অথচ প্রতিটি দূরত্বই তো আমাদের নিজেদেরই সৃষ্টি। স্টেশন চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকা সেই পুরনো গাছটার দিকে তাকাই—কত ট্রেন গেল, কত মানুষ গেল, কিন্তু গাছটা তো অভিমান করে পাতাটা ঝরায়নি। শুধু শিকড় বাড়িয়েছে নীরবে, যেন বলে—"জীবনকে জড়িয়ে ধরো, এত ছোট করো না।"
---
রাতের বেলা জানালা খুলে দিই। দূরের রাস্তা থেকে ভেসে আসে ট্রাকের হর্ন। কারো না কারো যাত্রা থামবে না তো! এই যে হঠাৎ হঠাৎ মন খারাপ—এটা সময়ের গায়ে লেখা চিরকুট। হয়তো ভবিষ্যতের আমি আজকের আমাকে লিখছে: "দেখো, ওই অভিমানটা করো নি যেন। ওই একাকীত্বের মুহূর্তে এক কাপ চা খেয়ে নিও। জীবন তো...বৃষ্টিভেজা পাতার মতো, এক ঝলকেই উধাও!"

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!