বইপাড়ার গলি দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে চোখ আটকে যায় সেই দৃশ্যে—এক তরুণ লেখককে ঘিরে পাঠকেরা ফুলের মতো ফুটে আছে। তার হাতে বই, মুখে উত্তরোত্তর প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন মৃদু হেসে। বইয়ের প্রচ্ছদে নামটা ঝলমলে সোনালি অক্ষরে: "সাদাত হোসাইন"। নামের নিচে ছোট্ট করে লেখা—"বেস্টসেলার"। আমার জুতোর ফিতা খুলে যায়। বেঁধে নেওয়ার ছলে নিচু হয়ে দেখি, তার জুতোও কি আমার মতো ময়লা? না, চকচকে সাদা। হয়তো সাফল্যের রঙ শুধু বইয়ের পাতায় নয়, জুতোতেও লাগে!
---
গত বইমেলায় দূর থেকে দেখেছি, তার স্টলের সামনে লাইনটা নদীর স্রোতের মতো বেঁকেছে। এক কিশোরী মেয়ে হাতে বই নিয়ে কাঁপছে, "স্যার, আমার মা বলেছেন আপনি স্বপ্ন দেখতে শেখান!" সাদাত তখন স্বাক্ষর দিচ্ছিলেন, বলছিলেন—"তোমার মায়ের চোখেই আমার পরবর্তী উপন্যাসের নায়িকা।" আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম পাশের স্টলে, যেখানে আমার বইগুলো সাজানো ছিল পোস্টার ছাড়া। এক বৃদ্ধা এসে জিজ্ঞেস করেছিলেন, "এগুলো কি বাংলা একাডেমির ছাড়পত্র পাওয়া বই?" হ্যাঁ, বলতে পারিনি—"না, এগুলো ছাড়া-পাওয়া হৃদয়ের গল্প।"
---
পাড়ার মোড়ের কফিহাউসের নোনা কাঠের টেবিলে বসে লিখি আজও। পাশের টেবিলে এক যুবক বলছে বন্ধুকে—"হুমায়ূন আহমেদের মতো হওয়া যায় না, ওঁর জাদু ছিল!" আমি চায়ের কাপে চুমুক দিই। জাদু? হুমায়ূন তো লিখতেন রাস্তার ধুলোয় বসে, আমি লিখি রাস্তার আলো নিভে গেলে। পার্থক্য শুধু এটুকুই যে, তাঁর লেখায় ধুলো হয়ে উঠত সোনা, আর আমার সোনা হয়ে যায় ধুলো। তবু স্বপ্ন দেখি—কোনো এক ভবিষ্যতে, কোনো এক কিশোরী বলবে, "এই লেখক তো আমার কথা লিখেছেন!"
---
রাতের ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে ভাবি: সাদাত হোসাইনের প্রথম বই বিক্রি হয়েছিল কত কপি? গুগল করে জেনেছি, সংখ্যাটা বিশাল। কিন্তু সংখ্যার চেয়ে বড় কথা—সেই বই যারা কিনেছিল, তারা কি আজও সাদাতের গল্পের চরিত্রদের সাথে হাঁটে? আমার পাঠক যদি একজনও থাকে যে রাতের বাসায় জানালায় ঠেস দিয়ে আমার গল্প পড়ে, তাহলে আমার চেয়ে আর ধনী কে? কিন্তু হায়, এই ধন কোথায় জমা হয়?
---
আজ সকালে একা একা বইপাড়ায় গিয়েছিলাম। সাদাতের নতুন বইয়ের পোস্টার লাগানো হচ্ছিল। পোস্টারের নিচে ছোট্ট লেখা—"স্বপ্ন দেখো, স্বপ্ন ছুঁয়ো!" আমি আমার পুরনো ডায়েরি থেকে একটা পাতা ছিঁড়ে সেখানে লিখে রেখে এলাম—"স্বপ্ন দেখাই যখন স্বপ্ন, তখন ছোঁয়ার বিলাস কীসের?" ফেরার পথে কিনে নিয়েছি একটা নতুন কলম। এর কালি শুকোলে হয়তো একদিন লিখব—"সেই ফেরিওয়ালা যে অক্ষর বেচে না, অক্ষরে বেঁচে থাকে।"
[গত পরশু বইমেলাতে অন্যধারায় গিয়েছিলাম ফারুক ভাইয়ের সাথে দেখা করতে। সেখানে তখন ভীষন লম্বা এক লাইনে দাড়ানো ছেলে বুড়ো সবাইকে অটোগ্রাফ দিচ্ছিলেন সাদাত হোসাইন। একইরকম দৃশ্য দেখেছিলাম দুই বছর আগে - কলকাতা বইমেলায়। পুরো বইমেলায় অটোগ্রাফ নেবার মিছিল হয়েছিল শুধু তারই সামনে। গর্বে আমার চোখে পানি এসে গিয়েছিল। এই ছোট্ট মনোলোগটি প্রিয় লেখক Sadat Hossainকেই উৎসর্গ করা]