জীবন শুধু বেঁচে থাকার নাম নয়

আমি গ্রামের ছেলে নই। গ্রামে আমার শৈশবের কোনো স্মৃতি নেই। আমার পায়ের তলায় লেগে থাকা ধুলো মফস্বলের, গ্রামের নয়। আমি বেড়ে উঠেছি ছোট্ট শহরতলির বুকের ভাঁজে, যেখানে বিকেলের আলোয় মিশে থাকে কাঁচা রাস্তার ধুলো আর দূরের মাঠের সবুজ ঘ্রাণ। আমার শরীরে এখনও মফস্বলের সেই গন্ধ লেগে আছে—একটু সাদামাটা, একটু মাটির মতো। আমি মফস্বল ভালোবাসি, কারণ এখানেই আমি প্রথম শিখেছি জীবনের ছোটখাটো আনন্দের মানে। তবুও, গ্রামের ডাক আমি অস্বীকার করতে পারি না। যদিও গ্রাম আমার নয়, তবুও যেন মনে হয়, কোথাও এক অদৃশ্য সম্পর্ক আছে, যা আমাকে টানে—একটা শেকড়ের মতো।
 
আমি যৌথ পরিবারে বড় হইনি। একান্নবর্তী সংসারের গল্পগুলো কেবল বইয়ের পাতায় পড়েছি কিংবা অন্যের মুখে শুনেছি। সেই গল্পগুলোতে ছিল একসঙ্গে বসে খাবার ভাগ করে খাওয়ার আনন্দ, ছিল দাদা-দাদির স্নেহমাখা হাতের পরশ, ছিল ভাই-বোনদের খুনসুটি আর চাচা-চাচিদের হাসি-ঠাট্টার আড্ডা। আমি কখনও সে ভালোবাসার ছায়ায় বসিনি, কিন্তু তবুও যেন সেই অদেখা সংসারের প্রতি আমার এক গভীর আকর্ষণ কাজ করে। মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি কোনো এক বিশাল পুরনো বাড়িতে থাকতাম! যেখানে প্রতিটি জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ত সকালের রোদ আর পরিবারের কোলাহলমুখর হাসি।
 
শহরের এই ব্যস্ত জীবন আমাকে ক্লান্ত করে ফেলেছে। ইট-কাঠের এই জগৎ যেন আমাকে গিলে খেতে চায়। চারপাশে মানুষের ভিড়, অথচ ভেতরে ভেতরে আমি বড্ড একা। একাকিত্বের এই ভার বইতে বইতে মন যেন হাঁপিয়ে উঠেছে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় সব ছেড়ে দিয়ে চলে যাই গ্রামে—একটা শান্তির ঠিকানায়। সেখানে এক বিশাল বাড়ি হবে, যে বাড়ির প্রতিটি কোণ থেকে ভেসে আসবে মানুষের শব্দ—হাসি-কান্না, গান আর গল্পের সুর। সন্ধ্যা নামলে উঠোনে বসবে গল্পের আসর; রাত গভীর হলে সবাই একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়বে শান্তির ছায়ায়।
 
আমরা বড় একা হয়ে গেছি। আধুনিক জীবনের এই যান্ত্রিকতায় আমরা নিজেদের হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের হৃদয়ের শূন্যতা পূরণ করার কেউ নেই। তাই হয়তো গ্রামের সেই ডাক আমাকে বারবার টানে। মনে হয়, প্রকৃত সুখ লুকিয়ে আছে সেখানেই—যেখানে মানুষ মানুষকে আঁকড়ে ধরে বাঁচে। যেখানে জীবন শুধু বেঁচে থাকার নাম নয়; বরং ভালোবাসার গল্প লেখার নাম।

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!