দুটোই আমার জীবনের ভেতর আলাদা আলাদা নদীর মতো বয়ে গেছে

দুটোই আমার জীবনের ভেতর আলাদা আলাদা নদীর মতো বয়ে গেছে

একজন আমার চেয়ে দেড় বছরের ছোট। আরেকজন প্রায় বারো বছরের। বয়সের এই সামান্য আর বিশাল ফারাক—দুটোই আমার জীবনের ভেতর আলাদা আলাদা নদীর মতো বয়ে গেছে।

দেড় বছরের ছোটটার সঙ্গে সম্পর্কটা জন্মের পর থেকেই যেন যুদ্ধবিরতির মধ্যে আটকে থাকা যুদ্ধ। ছোটবেলার ঘর, খেলনা, বইয়ের তাক—সব জায়গাতেই আমাদের দখলদারির লড়াই চলত। কখনো চুল টানা, কখনো খাতা লুকিয়ে রাখা, কখনো দরজা ধাক্কা মেরে বন্ধ করে দেওয়া। নবম শ্রেণীতে উঠেই হঠাৎ মনে হলো—একে শত্রু বানিয়ে রাখা যাবে না। সামনে প্রেম-ট্রেমের জটিল দুনিয়া, সেখানে একজন নির্ভরযোগ্য সহযোদ্ধা দরকার। ঠিক তখনই আমরা অঘোষিত চুক্তিতে বন্ধু হলাম। আমি ডেটিং করে ঝামেলা পাকাতাম, সে নীরবে সেই ঝামেলাগুলো সামলে দিত। ফোন ধরত, মিথ্যে অজুহাত বানাত, পরিস্থিতি ঠান্ডা করত। ধীরে ধীরে টের পেলাম—আমরা শুধু বন্ধু না, একে অপরের সবচেয়ে কাছের মানুষ হয়ে উঠেছি।


তবু সম্পর্ক বলে কথা—সেখানে ভাঙন আসবেই। আবার ঝগড়া হলো। সেই ঝগড়া ধীরে ধীরে দূরত্বে পরিণত হলো। দূরত্ব এমন জায়গায় পৌঁছাল, যেন মাঝখানে সমুদ্র, তারপর মহাদেশ। কথা কমে গেল, বোঝাপড়া শুকিয়ে গেল। তবু কোথাও একটা সুতো রয়ে গেল, অদৃশ্য অথচ টানটান।

আর যে বারো বছরের ছোট—তার প্রতি আমার ভালোবাসা ছিল একটু বেশি কর্তৃত্বমাখা। বয়সের ফারাকে যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটা অধিকারবোধ এসে বসেছিল। তাকে শাসাতাম, বকতাম, ঠিক করতে চাইতাম। পরে বুঝেছি, ভালোবাসা আর নিয়ন্ত্রণ এক জিনিস নয়। সেই অধিকারবোধটাকেই একদিন আনুষ্ঠানিকভাবে ছেড়ে দিতে হয়েছিল আমাকে। বলতে হয়েছিল—তুমি নিজের মতো বড় হও, নিজের মতো হাঁটো।

একসময় আমরা তিনজনই বুঝতে পারলাম—আমাদের জীবনে শুধু ভালো স্মৃতি নেই, বরং অনেক জায়গায় স্মৃতিরই অভাব। সেই শূন্যতা আমাদের অস্বস্তি দিতে লাগল। তখন আমরা ইচ্ছে করে স্মৃতি বানাতে শুরু করলাম। একসাথে সময় কাটানো, হঠাৎ ফোন করা, অকারণে হাসা, পুরোনো কথা টেনে আনা—ভালো কিংবা মন্দ, যা-ই হোক, স্মৃতি তো হোক। আমরা ধীরে ধীরে আবার নিজেদের গল্প লিখতে লাগলাম।

দিনের শেষে আমি আবিষ্কার করলাম—আমার একাকী জীবনের ভেতর এই দুজনই আমার সব। আমার রাগ, আমার অভিমান, আমার হঠাৎ অকারণ হাসি—সবকিছুর ঠিকানা ওরা। হয়তো আমরা আলাদা শহরে, আলাদা দেশে, আলাদা মহাদেশে আলাদা সময়ের মধ্যে বাস করি। তবু আমি জানি, এমন একটা জায়গা আছে পৃথিবীতে যেখানে আমার জন্য দুটো দরজা খোলা থাকে। যেখানে আমি ভাই, আমি আশ্রয়, আমি নির্ভরতা।

ওরা আমার দুই ছোট বোন—নিশাত আর নাবিলা। নামের ভেতরেই আছে ঘরের গন্ধ। আমার হৃদয়ের ভেতর যে অংশটুকু একেবারে ব্যক্তিগত, যে জায়গায় আর কেউ ঢোকে না—সেই জায়গাটা ওদের জন্যই রাখা। আমার সবটুকু ভালোবাসা, সবটুকু আপন করে রাখা সত্তা—ওদেরই। 
See less
— with Syeda N. Mowla and Syeda Zohora.

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!