সে আমার স্কুল-বন্ধুর ছোট গিন্নী

সে আমার স্কুল-বন্ধুর ছোট গিন্নী

কক্সবাজারে প্রথম যেদিন ওর সাথে দেখা, সেদিনটা আসলে পরিচয়ের দিন না—সেদিনটা ছিল প্রায় দুর্ঘটনার দিন। আমার প্যাটেলা প্রায় ভেঙেই দিচ্ছিল সে। আর একটু হলেই ঢাকায় না গিয়ে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি হতে হতো। ভাগ্যিস হতে হয়নি। সেই না-ভর্তিই আমাদের জীবনের এক অদ্ভুত দরজা খুলে দিল। মানুষকে কখনো কখনো ব্যথাই পরিচয় করিয়ে দেয়—এই সত্যিটা আমি সেদিন শিখেছিলাম।

অনেক পিচ্চি সে। প্রথম দিকে তাই একটু দূরত্ব ছিল, একটু কৌতুকও। তারপর হঠাৎ একদিন জানা গেল—সে আমার স্কুল-বন্ধুর ছোট গিন্নী। অদ্ভুত এক টান এসে গেল তখন। যেন রক্তের সম্পর্ক না হয়েও একটা অধিকার জন্ম নিল। সেই অধিকারবোধকে ষোল আনাতে উন্নীত করে দিল ওর স্বামী, বড় বোন আর মা। একসময় বুঝলাম, ওদের পুরো পরিবারটাই আমাকে নিজেদের ভেতরে টেনে নিয়েছে।


তার ফলাফল ছিল মিশ্র—সপ্তাহে দুইদিন ভালো সম্পর্ক থাকলে পাঁচদিনই ঝগড়া-ঝাঁটি। তর্ক, অভিমান, দরজা বন্ধ করে থাকা, আবার একটু পরেই চা বানিয়ে সামনে এনে রাখা। আগে যেখানে সপ্তাহে সাতদিনই ফুডপান্ডায় ভরসা ছিল, সেখানে সেটা কমে দাঁড়াল দুই-তিন দিনে। আগে যেখানে সপ্তাহে একদিন রাতে মেরিন ড্রাইভে যেতাম, সেখানে সেটা হয়ে গেল পাঁচদিন। সমুদ্রের বাতাসে দাঁড়িয়ে ঝগড়া, আবার সেই বাতাসেই মিল।

ও আমাকে জ্বালিয়েছে প্রচুর। আবার ভালোবাসতেও কৃপণতা করেনি একটুও। করোনার সময় যখন চারপাশ আতঙ্কে ভরা, তখন একাই আমাদের সাত-আটজনের জন্য রান্না করত দিনের পর দিন। ভোর থেকে রাত—চুলা, হাঁড়ি, থালা—সব সামলে। আমার মাঝরাতে শরীর খারাপ হয়েছে, আমি নিজেই বুঝে ওঠার আগেই ও আর সাগর কিংবা সাজ্জাদ আমাকে নিয়ে ছুটেছে হাসপাতালে। কোথাও কোনো সমস্যায় পড়েছি, আমি যতটা চিন্তা করেছি, তার চেয়ে বেশি অস্থির হয়েছে সে।

আমার মা নেই। সেই শূন্যতায় আন্টি এসে দাঁড়ালেন, একদম নিঃশব্দে। আমার বোন নেই—ওর বড় বোন সেই জায়গাটা পূরণ করতে গিয়ে নিজেই অস্থির হয়ে যেত। আমার ছোট ভাই নেই—ওর জীবনসঙ্গী এসে দাঁড়াল সেই ভূমিকায়। ওর ভাগ্না-ভাগ্নীদের কাছে আমি যেন মামার চেয়েও বেশি কিছু। একেকটা সম্পর্ক ধীরে ধীরে এসে জুড়ে গেল আমার ভাঙাচোরা জীবনের সঙ্গে।

রাতের বেলা কখনো মেয়েদের কথা মনে করে হুহু করে কেঁদেছি। তখন আমাকে পাহারা দিয়েছে—যেন আবেগের মাথায় কোনো বোকামি না করি। আমার মোটা মোটা বই লিখতে হতো, রাত জেগে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কফি বানিয়ে আমাকে জাগিয়ে রেখেছে। অতিথি এলে রান্না থেকে শুরু করে সব আয়োজন—একটু যেন লজ্জা না পাই, সেই খেয়াল রাখা হয়েছে। ঢাকায় থেকে কিছু আনতে হবে? ব্যবস্থা হয়ে গেছে। মিশর যাবার স্বপ্ন বলেছি—হঠাৎ দেখি, সেটারও পথ তৈরি।

এই আরামে আমি ছিলাম। অস্বীকার করার উপায় নেই। এমন আরাম, যেখানে কেউ আমার আগে আমার কথা চিন্তা করে। এখন সে নেই এখানে। দূরে। আর আমি বুঝি—কী হারিয়েছি। যে জীবনটাকে স্বাভাবিক ভেবেছিলাম, সেটা আসলে ছিল আশীর্বাদ। এখনকার জীবনটা তার তুলনায় অনেক বেশি কঠিন, অনেক বেশি নির্জন।

তবু চাই, সে দূর দেশে ভালো থাকুক। নিজের স্বপ্ন পূরণ করুক। একদিন আমাদের ডেকে নিয়ে যাক নতুন নতুন দেশে—দেখাক তার চোখে দেখা পৃথিবী (আমার তালিকা এখানে দিয়ে দিচ্ছি- মেক্সিকো, পেরু, ভেনেজুয়েলা, গুয়াতেমালা, ইকুয়েডর, গ্রিস, নাইজেরিয়া, কেনিয়া, উগান্ডা - আপাতত এইগুলা 🙂 ) ।

সে আর কেউ না—সে আমার আদরের পিচ্চি বোন নাবিলা।
আর Syeda ZohoraSyeda N. Mowla—তোরা রাগ করিস না। আমরা আমরাই তো। 🙂 
 

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!