দ্বিতীয় রামিসেসের পাসপোর্ট

May be an image of money and text that says 'Type P Country Code EGY Passport No/ I A17758024 Full Name RAMESSES|I II Place Of Birth ---- Date Of Birth --/--/1303 Bc Nationality EGYPTIAN Date of Issue 09/03/19 Issuing Office Sex M Date of Expiry 09/03/1981 ARABREPUBLICOFEGYPT ARAB REPUBLIC OF EGYPT Profession King (deceased)'
 
📕 সাহিত্যের ক্ষেত্রে মিথ আর বাস্তবতার প্রকাশ: দ্বিতীয় রামিসেসের পাসপোর্ট
 
দ্বিতীয় রামিসেসের মমি একবার ফ্রান্সে ভ্রমণ করেছিল। ফ্রান্সে যাবার সময় তার পাসপোর্ট ইস্যু করা হয়েছিল। পৃথিবীর বিখ্যাত বিখ্যাত ইজিপ্টোলজিস্টরাও তাদের লেখাগুলোতে এই পাসপোর্টের কথা উল্লেখ করেছেন। এমনকি আমিও আমার "মিশরীয় মিথলজি-আদি থেকে অন্ত" গ্রন্থেও লিখেছি রামিসেস পাসপোর্ট নিয়েই ফ্রান্সে গিয়েছিলেন। এটা মিথ? না কি বাস্তব?
 
চলুন, পুরো গল্পটা একবার একেবারে গোড়া থেকে, ঠান্ডা মাথায়, ঝরঝরে করে গুছিয়ে দেখি—কোথায় প্রমাণ, আর কোথায় কিংবদন্তি।
 
💢 আসল ঘটনা: কেন রামেসিসকে ফ্রান্সে পাঠানো হলো?
 
১৯৭০–এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কায়রোর মিউজিয়ামে রাখা দ্বিতীয় রামিসেসের মমিতে সমস্যা ধরা পড়ে।
হঠাৎ দেখা গেল—
• মমির দেহের ওপর ছত্রাক (fungus) জন্মাচ্ছে
• কাপড়, চামড়া, রেজিনের স্তরে ক্ষয় দেখা দিচ্ছে
• দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণ ঝুঁকির মুখে পড়বে
তখনকার মিশরে এই ধরনের উচ্চমানের সংরক্ষণ ও মাইক্রোবায়োলজিক্যাল ট্রিটমেন্টের জন্য পর্যাপ্ত সুবিধা ছিল না। তাই মিশর সরকার সিদ্ধান্ত নেয়:
দ্বিতীয় রামিসেসের মমিকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার জন্য ও সংরক্ষণের চিকিৎসার জন্য ফ্রান্সে পাঠানো হবে।
এই কাজের জন্য ফরাসি মিশরবিদ ও সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের একটা দল তৈরি হয়, সঙ্গে ছিলেন চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরাও। কয়েক মাস ফ্রান্সে থেকে মমিটির এক্স–রে, স্ক্যান, টিস্যু পরীক্ষা, ফাঙ্গাল ট্রিটমেন্ট, মেরামত—সব হবে, তারপর আবার মিশরে ফিরিয়ে আনা হবে।
এ পর্যন্ত সবকিছু ১০০% প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস, কোনো বিতর্ক নেই।
 
💢 সমস্যা শুরু আইন থেকে: “মানুষের দেহাবশেষ” ফ্রান্সে ঢুকবে কীভাবে?
 
এখন আসি ফরাসি আইনের কথায়। ফ্রান্সে নিয়ম হল:
👀যে কোনো মানুষের দেহাবশেষ (human remains) দেশে ঢোকাতে হলে আইনগত নথি লাগবে।
এটা হতে পারে—
• মৃত্যুসনদ
• এক্সপোর্ট পারমিট
• বিশেষ ভ্রমণ–অনুমতি ইত্যাদি
রামিসেস অবশ্য “ডেড বডি” না, মমি—৩,০০০ বছরের পুরোনো। কিন্তু আইনের চোখে তাও human remains-ই। তাই মিশর ও ফ্রান্সের প্রশাসন বসে সিদ্ধান্ত নিল:
মমিটির জন্য একটি অফিসিয়াল ভ্রমণ–নথি বানানো হবে, যাতে কাস্টমস, স্বাস্থ্য ও আইনি সব দিক কাভার হয়।
এখানেই সেই বিখ্যাত “ডকুমেন্ট”–এর জন্ম।
• এই নথিতে সম্ভবত লেখা ছিল মমির পরিচয় (Ramesses II, royal mummy, museum object ইত্যাদি)
• কেন তাকে আনা হচ্ছে (scientific conservation)
• কোন কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে
• কতদিন থাকবে, কীভাবে ফিরিয়ে আনা হবে
অর্থাৎ, নথি ছিল—এটা প্রমাণসহ খুবই যৌক্তিক ও বিশ্বাসযোগ্য।
 
💢 তাহলে “পাসপোর্ট” শব্দটা এলো কোথা থেকে?
 
এখন আসল মজার জায়গা:
ফরাসি ভাষায় একটা শব্দ আছে: passeport
এই শব্দটি ব্যবহার হয়—
• আমাদের চেনা “পাসপোর্ট” অর্থে
• আবার অনেক সময় যেকোনো ভ্রমণ অনুমতিপত্র / ট্রাভেল ডকুমেন্ট বোঝাতেও ব্যবহৃত হয়
ধরা হয়, মমির জন্য যে নথি করা হয়েছিল, প্রশাসনিক কথাবার্তায় তাকে passeport বা “travel papers” বলা হয়েছিল।
পরে সাংবাদিক, জনপ্রিয় লেখক, পপুলার হিস্ট্রি–ধরনের লেখকরা এটাকে সুন্দর করে সাজিয়ে লিখতে শুরু করলো:
“Egypt issued a passport for Ramesses II so that he could travel to France.”
এটা শুনতেই দারুণ লাগে, তাই খুব দ্রুত—
• পত্রিকায়
• ডকুমেন্টারি স্ক্রিপ্টে
• সোশ্যাল মিডিয়ায়
গল্পটা ছড়িয়ে পড়ে—
“৩,০০০ বছর পরেও ফারাও রামিসেস নিজের পাসপোর্ট নিয়ে বিমানে চড়ে ফ্রান্সে গেলেন!”
বাস্তবে যা ছিল সম্ভবত “অফিসিয়াল ট্রাভেল ডকুমেন্ট”,
তা গল্পের জগতে পৌঁছে হয়ে গেলো “কিংবদন্তি পাসপোর্ট”।
 
💢 কী কী আমরা নিশ্চিতভাবে জানি?
 
এখন একটু কড়া ভাবে দেখি—কোন অংশে আমরা নিশ্চিত:
📌 রামেসিস দ্বিতীয়ের মমি ফ্রান্সে গিয়েছিল
– হ্যাঁ, ১৯৭০–এর দশকে, বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণের জন্য।
– এ নিয়ে ভিডিও ফুটেজ, বৈজ্ঞানিক আর্টিকেল, মিউজিয়ামের রেকর্ড—সব আছে।
📌 ফ্রান্সের আইনে নথি বাধ্যতামূলক ছিল
– মানবদেহের অবশিষ্টাংশ আনার ক্ষেত্রে আইনি ডকুমেন্ট দরকার—এটা ফরাসি আইনেই লেখা।
📌 কোনো না কোনো ফর্মে অফিসিয়াল ডকুমেন্ট করা হয়েছিল
– বৈজ্ঞানিক রিপোর্টে “papers” বা “legal documents” এর উল্লেখ আছে।
– মিশরীয় ও ফরাসি রিপোর্টে বলা হয়েছে যে মমিটি “official documents”–সহ এসেছে।
এখন পর্যন্ত কোনো সিরিয়াস ইতিহাসবিদ এসব নিয়ে আপত্তি করেননি।
 
💢 আর কোথায় আমাদের সন্দেহ রাখা উচিত?
 
এবার দেখি, কোথায় গল্পটা ঢুকে পড়ে:
📌 ওই ডকুমেন্টের আসল কপি, ছবি বা স্ক্যান
– জনসমক্ষে কখনো প্রকাশিত হয়নি।
– কেউ দেখিয়ে বলতে পারেনি: “এই যে, এটাই রামিসেসের পাসপোর্ট।”
📌 বিজ্ঞানীদের লেখা রিপোর্টে “passport” শব্দই নেই
– তারা লিখেছেন “documents”, “papers”, “official travel documents” ইত্যাদি।
– কেউ বলেননি: “He had an Egyptian passport issued in his name.”
📌 মিশরীয় অফিসিয়াল মন্তব্যও খুব নিউট্রাল
– বহু বছর পর তারা বলেছেন:
– ভ্রমণ–সংক্রান্ত নথি ছিল,
– কিন্তু “পাসপোর্ট” গল্পটা আংশিক ভুল বা অতিরঞ্জিত।
📌 পাসপোর্ট–ধরনের ছবি / ডিজাইন / কপি
– যেগুলো মাঝে মাঝে ইন্টারনেটে ঘুরে বেড়ায়,
– সেগুলোর বেশিরভাগই পরের যুগের আর্টওয়ার্ক বা ইলাস্ট্রেশন,
– মৌলিক প্রমাণ হিসেবে ধরা যায় না।
অর্থাৎ—
• “ডকুমেন্ট ছিল” → খুবই শক্ত কথা
• “পুরোদস্তুর আধুনিক পাসপোর্ট ছিল” → প্রমাণহীন, অনেকটাই কিংবদন্তি
 
💢 ফরাসি কর্তৃপক্ষ কেন স্পষ্ট করে কিছু বলল না?
 
এটাও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এর উত্তর খুব সোজা, আর খুবই প্রশাসনিক।
• তাদের কাছে এই ঘটনা ছিল একটি বৈজ্ঞানিক মিশন
• মিডিয়া এটাকে “পাসপোর্ট” বলে রোমান্টিক গল্প বানিয়েছে
• কিন্তু এই বিষয়ে না কোনো আইনি ঝামেলা হয়েছে,
না কোনো বড় রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছে
তাই ফরাসি সরকার বা সংশ্লিষ্ট সংস্থা কখনও মনে করেনি:
“আচ্ছা, চল আমরা আলাদা করে প্রেস কনফারেন্স ডেকে বলে দিই— এটা পাসপোর্ট না, এটা শুধু ট্রাভেল ডকুমেন্ট!”
সরকার সাধারণত তখনই চিৎকার করে ব্যাখ্যা দেয়, যখন না দিলে ঝামেলা হয়। এখানে তো ঝামেলাই ছিল না—বরং একটা সুন্দর, harmless কিংবদন্তি। তাই বিষয়টা অমীমাংসিত অবস্থায় পড়ে থাকলো।
 
💢 তাহলে শেষ কথা কী দাঁড়ায়?
 
সব প্রমাণ, যুক্তি আর কিংবদন্তি একসাথে রেখে যদি রায় দিতে হয়, শান্ত মাথায় দাঁড়ায় এমন কিছু:
🔺 দ্বিতীয় রামিসেস সত্যিই ফ্রান্সে গিয়েছিল
– বৈজ্ঞানিক সংরক্ষণ ও চিকিৎসার জন্য
– সেখানে তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া হয়েছিল
– গার্ড অব অনার, গবেষণা, রিপোর্ট—সবই প্রমাণিত
🔺 তার ভ্রমণের জন্য অফিসিয়াল ডকুমেন্ট ছিল
– এটা ছাড়া ফ্রান্সে প্রবেশ সম্ভবই না
– রিপোর্টে “official documents”–এর উল্লেখ আছে
🔺 এই ডকুমেন্টকে জনপ্রিয় ইতিহাস “পাসপোর্ট” বলে ডাকতে শুরু করেছে
– হয়তো প্রশাসনিক নথিতে “passeport” শব্দ ব্যবহার হয়েছিল
– কিন্তু তা আমাদের হাতে থাকা আধুনিক পাসপোর্টের মতো ছিল কি না—প্রমাণ নেই
🔺 গল্পটা সুন্দর হওয়ায় মানুষ মেনে নিয়েছে—“ফারাওয়ের পাসপোর্ট”
– এবং ধীরে ধীরে সত্যি ও মিথ একসাথে মিশে গেছে
তাই যুক্তিসঙ্গত ভাষায় বলা যায়:
👀 দ্বিতীয় রামিসেসের জন্য ভ্রমণ–নথি ছিল (প্রমাণ আছে)।
এটাকে “পুরোদস্তুর পাসপোর্ট” বলা—অতিরঞ্জিত / আধা-মিথ।
 
💢 ইতিহাস বনাম সাহিত্য: তুমি কীভাবে ব্যবহার করবে?
 
আমি যেহেতু লেখক, আমার জন্য এখানে দুটো আলাদা লেভেল আছে—
• ইতিহাসের লেভেল:
– লিখব: “রামেসিসের ফ্রান্স যাত্রার জন্য অফিসিয়াল ট্রাভেল ডকুমেন্ট ইস্যু করা হয়েছিল, যেটিকে জনপ্রিয়ভাবে ‘পাসপোর্ট’ বলা হয়, যদিও তা আধুনিক পাসপোর্ট ছিল কিনা, প্রমাণ নেই।”
• মিথ–মেশানো সাহিত্যিক লেভেল:
– আমি ইচ্ছে করলে গল্পে লিখতে পারি:
“মৃত্যুর তিন হাজার বছর পর, প্রাচীন ফারাও দ্বিতীয় রামিসেস আবারও একবার পাসপোর্ট হাতে নিয়ে বিদেশে পা রাখলেন—
তবে এবার যুদ্ধের জন্য নয়, নিজের শরীর বাঁচাতে।”
সত্য আর কিংবদন্তি—দুটোকে আলাদা করে চিনে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ, কিন্তু সাহিত্য লিখতে গেলে এই দুইয়ের মাঝের ফাঁকটুকুই তো সবচেয়ে রোমাঞ্চকর জায়গা।
 
ছবি পরিচিতি: রামিসেসের পাসপোর্ট (আসল নয়)
 

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!