আমি খুব নার্সিসিস্ট ধরনের মানুষ। কেউ আমার প্রশংসা করলে এমন একটা ভাব করি, যেন কথাটা আমার কানেই পৌঁছায়নি। মুখে উদাসীনতা রাখি, চোখে রাখি নির্লিপ্তির অভিনয়। অথচ ভেতরে ভেতরে তখন কী যে আনন্দ হয়, তা কাউকে বোঝাই না। মনে হয়, বুকের গভীরে কেউ আলতো করে একটা বাতি জ্বেলে দিয়েছে।
আবার আমাকে নিয়ে, আমার লেখা নিয়ে, কিংবা আমার বই নিয়ে কেউ সামান্য মন্দ কিছু বললেও আমি কষ্ট পাই। খুব কষ্ট পাই। বাইরে থেকে হয়তো সেটাকে তেমন কিছু মনে হয় না, কিন্তু ভেতরে সেটা অনেক দূর পর্যন্ত গিয়ে লাগে। যেন কথাটা কানের কাছে থেমে থাকে না, সরাসরি কোথাও খুব নরম জায়গায় গিয়ে বসে।
কোনো আড্ডায় গেলে আমার মাঝখানে থাকতে ইচ্ছা করে। কথার কেন্দ্র, হাসির কেন্দ্র, মনোযোগের কেন্দ্র। সবাই আমাকে ঘিরে থাকুক, আমার কথা শুনুক, আমার দিকে তাকাক, এমন একটা শিশুসুলভ চাওয়া ভেতরে ভেতরে কাজ করে। সেটা না হলে অদ্ভুত অস্থির লাগে। মনে হয়, ঘরের ভেতর থেকেও আমি যেন ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। তখন আর থাকতে ইচ্ছা করে না। থাকতে পারি না।
আমাকে আঘাত করা খুব সহজ। কারণ আমার ভেতরটা খুব শক্ত করে বানানো নয়। আমি কষ্ট পেলে সেটা লুকাতে পারি না। মুখে, চোখে, চুপ করে থাকার ভঙ্গিতে, সবখানেই তা প্রকাশ হয়ে যায়। রাগ হলেও একই কথা। রাগটা প্রকাশ না করা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই। অথচ অদ্ভুত ব্যাপার হলো, একবার বলে ফেলতে পারলেই রাগটা আর থাকে না। যেন ভেতরে জমে থাকা ধোঁয়াটা দরজা পেয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়।
আমি অনেক কিছু ভুলে যাই। অনেক কিছু ক্ষমা করে দিই। কখনো ইচ্ছা করে, কখনো না করেও। মানুষকে ধরে রাখতে রাখতে, সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখতে রাখতে, নিজেকে বোঝাতে বোঝাতে আমি অনেক হিসাব মুছে ফেলি। হয়তো এইসব দুর্বলতা, অহংকার, অভিমান, ক্ষমা আর ভুলে যাওয়ার ভেতর দিয়েই আমি নিয়াজ।
তাই হয়তো কষ্টও পাই খুব। তবু হাসতে থাকি। কারণ হাসিটাই সবচেয়ে ভালো পারি আমি। এই হাসিটাই আমার পুরোনো রক্ষাকবচ। এই হাসির আড়ালেই অনেক অপমান, অনেক না বলা কথা, অনেক একা রাত চাপা পড়ে থাকে। আর লেখালেখি। লেখালেখি আমার কাছে শুধু কাজ না, শুধু অভ্যাস না। এটা আমার ওষুধ। যখন ভেতরটা খুব বেশি শব্দ করে, তখন শব্দ দিয়েই আমি তাকে শান্ত করি।
যারা আমাকে বাইরে থেকে দেখে, তারা আসলে আমাকে চেনে না। মানুষকে জানা কঠিন। মানুষের ভেতরটা জানা তার চেয়েও কঠিন। আর আমার ভেতরটা জানা হয়তো আরো কঠিন। কারণ আমি অনেক দিন ধরে মুখোশ পরে থাকতে থাকতে মুখোশের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।
কখনো কখনো মনে হয়, মুখোশটাই এখন আমার আসল মুখ হয়ে গেছে। আর যে মানুষটা ভেতরে থাকে, সে হয়তো এখনো চুপচাপ অপেক্ষা করছে। কেউ একদিন সত্যি সত্যি তাকে চিনবে বলে।
আমার "ব্যথার রাজ্যে আনন্দের খোঁজে" হাতে আমার এই ছবিটা তুলেছে কক্সবাজার থেকে একেবারে চলে যাওয়ার ব্যস্ততার মাঝেও Tasmiah Afroze। তৃষা, বেস্ট অব লাক। তুমি চলে যাওয়াতে আমার অনেক প্রোফাইল পিকচার আর তোলা হবে না। 