ফনীর ভালোবাসা
গতরাত থেকেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামছিল। বোঝাই যাচ্ছিল ফনী ক্রমশ এগিয়ে আসছে। গত কয়েকদিন ধরে এমন দাবদাহ যে শরীর-মন দুটোই হাঁসফাঁস করছিল। প্রতিদিন বিকেলের দিকে সৈকতের কাছাকাছি যাই আমি — তবে সেই উদ্দাম জলরাশিতে গা ডোবানো কখনো হয়নি, হবেও না। দুই হাতে হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে যতটুকু কাছে পৌঁছানো যায়, সেটুকুই আমার প্রাপ্য। তার বেশি চাওয়ার সাহস ঈশ্বর অনেক আগেই কেড়ে নিয়েছেন। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। একদমই না।
একটা সময় ছিল — দুরন্ত যৌবন ছিল, বুকভরা উত্তাপ ছিল, মুখে নির্মল হাসি ছিল। আর ছিল একটা অসাধারণ ক্ষমতা — মানুষের জীবন বাঁচানোর ক্ষমতা। আমি ছিলাম নিউরোসার্জন। মরণাপন্ন কোনো রোগীর মাথার খুলি কেটে যখন মস্তিষ্কে হাত রাখতাম, মনে হত আমি আর শুধু মানুষ নই। কাউকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে বিদায় দিতাম, কাউকে হয়তো কিছুটা বাড়তি সময় কিনে দিতাম। আর যখন ব্যর্থ হতাম — সেই রাতগুলো ছিল ভয়ঙ্কর। চোখ বন্ধ করলেই দেখতাম, কেউ একজন নিজেকে আমার হাতে সম্পূর্ণ সঁপে দিয়েছিল — সেই বিশ্বাসের মর্যাদা আমি রাখতে পারিনি। বুকের ভেতর চাপা কান্না নিয়েই আবার অপারেশন থিয়েটারে দাঁড়িয়ে যেতাম। সেই জীবনটাকে ভালোবেসেছিলাম প্রাণ দিয়ে। যেভাবে ভালোবেসেছিলাম নীলাকে।
নীলার সাথে পরিচয় মেডিকেল কলেজেই। ও যখন সবে ভর্তি হয়েছে, আমি তখন বের হয়ে যাচ্ছি। একদিন কীভাবে যেন দেখা হয়ে গেল — ঈশ্বরের ইচ্ছে ছাড়া এমন হয় না। প্রথম দেখাতেই বুকের ভেতর কে যেন হাতুড়ি মারল। সাহস করে সামনে গিয়ে বলেছিলাম, “তোমাকে আজ প্রথম দেখলাম। তোমার সম্পর্কে কিছুই জানি না, জানতেও চাই না এখনই। শুধু এটুকু বুঝেছি — তোমাকে দেখার পর থেকে আমার ভেতরটা কেমন থমকে গেছে। এই থেমে থাকা আমার ভালো লাগছে না। আমি অস্থির হতে চাই — তোমার ভালোবাসায় অস্থির।” নীলা সেদিন মুখ ফেরাতে পারেনি।
তারপর একদিন নীলা আমাকে এক অমূল্য উপহার দিল। আমার ভালোবাসার বাগানে এলো এক ছোট্ট রাজকন্যা। কাঁপা কাঁপা হাতে যখন প্রথম তাকে বুকে তুলে নিয়েছিলাম, মাথায় তখন একটাই ভাবনা — এই রক্ত-মাংসের জীবন্ত পুতুলটা শুধু আমার, একেবারে নিজের মতো করে গড়ে তুলব। ঈশ্বর বোধহয় তখনই অন্য কিছু ভাবছিলেন।
কক্সবাজারে যখন মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গারা আসতে শুরু করল, আমার ভেতরে কী যে হলো। এতদিনের নিউরোসার্জারি ছেড়ে পাবলিক হেলথের চ্যালেঞ্জ নিলাম। চলে এলাম কক্সবাজারে, এক এনজিওর সাথে এক ক্যাম্প থেকে আরেক ক্যাম্পে ছুটতে লাগলাম। নীলা আর রাজকন্যা রয়ে গেল রাজধানীর নিয়নআলোয়।
তারপর একদিন সকালে দরজা খুলতেই দেখি নীলা আর রাজকন্যা দাঁড়িয়ে আছে। নীলা হেসে বলল, “এতদিন কক্সবাজারে আছ, একবারও ডাকলে না! রাস্তার দুই পাশে নিয়নবাতি নেই, তাতে কী — সাগরের গর্জন তো আছে! আর আছে বিশাল জলরাশি, যে তোমার রাজকন্যার পায়ের ছোঁয়ার অপেক্ষায়।” সেদিন রাজা, রানি আর রাজকন্যা মিলে সাগরের দিকে বেরিয়ে পড়েছিলাম। রাজকন্যা যেদিন প্রথম গুটি গুটি পায়ে সাগরের দিকে এগিয়ে গেল, আমি চোখ সরাতে পারছিলাম না। ঢেউ এসে যখন ওর ছোট্ট দুটি পা ভিজিয়ে দিল, ওর সেই কলকলিয়ে হাসি — সেটা আর কোনোদিন ভুলতে পারিনি।
মেরিন ড্রাইভ ধরে আমরা দূর বহুদূর চলে যেতাম। সন্ধ্যায় মারমেইড রিসোর্টে রাজকন্যা ছোট্ট পায়ে এলোমেলো দৌড়াত, আমি আর নীলা পাশাপাশি কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে ওকে দেখতাম। সূর্য ডুবে যেত, আমাদের তাকিয়ে থাকার শেষ হতো না। টেকনাফের পথে দূরন্ত বেগে যেতাম — বাতাসে রাজকন্যার ক্যাপ উড়ে যেত কোথায়, নীলার চুল আমার নাক-মুখ-চোখ ছুঁয়ে যেত আলতো করে। গতি আরো বাড়াতাম আমি। ঈশ্বর বোধহয় আর সহ্য করতে পারলেন না।
তিন মাস পর হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আমার সাথে ছিল শুধু একটা হুইলচেয়ার, আর ছিল বহু রাত জেগে হু হু করে কাঁদার মতো কিছু স্মৃতি। মেরিন ড্রাইভ ছেড়ে চলে যাইনি। এক ছোট্ট কুটিরে বসত গাড়লাম। প্রতিদিন বিকেলে হুইলচেয়ারে চড়ে সৈকতের কাছে আসি, আর অপেক্ষায় থাকি — ঈশ্বর আবার কবে হস্তক্ষেপ করবেন।
ফনীর প্রভাবে এই কয়দিন গরম আর গুমোটে টেকা দায় ছিল। ঘূর্ণিঝড়টা আশেপাশের সব মেঘ শুষে নিজেকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। আজ সকালে এনজিও আর সরকারের লোকজন সবাইকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে যাচ্ছিল। আমার কাছেও এসেছিল। যাইনি। আমার যাওয়ার কোথাও নেই — বা হয়তো যেতে চাইনি।
দুপুরের পর হঠাৎ ঝিরিঝিরি বৃষ্টি থেমে গেল। দমকা হাওয়া তীব্র হলো। মেঘগুলো পাগলের মতো ছুটতে লাগল এদিক-সেদিক। আমিও হুইলচেয়ার নিয়ে সৈকতে চলে এলাম।
মনের ভ্রম, না চোখের ধাঁধা? উত্তাল সাগরের বিশাল ঢেউগুলো আছড়ে পড়ছে দুটো ছোট্ট পায়ে। সেই আছড়ে পড়ায় রাজকন্যা উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ছে, আর পাশে দাঁড়ানো নীলা নীল শাড়িতে আমার দিকে তাকিয়ে খলখলিয়ে হাসছে। বহুদিন পর অশক্ত পা দুটো হুইলচেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। কোথা থেকে যেন শক্তি এলো — পা দুটো এগিয়ে যেতে লাগল সামনের দিকে। আমি সোজা হয়ে হাঁটছিলাম রাজকন্যা আর নীলার দিকে, আমার দিকে ছুটে আসছিল উত্তাল ঢেউ। তখনই বুঝলাম — আজ সেই দিন। ঈশ্বর আজ শেষবারের মতো হস্তক্ষেপ করবেন।
আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম…
যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,
আমি বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে,
চুকিয়ে দেব বেচা কেনা,
মিটিয়ে দেব গো, মিটিয়ে দেব লেনাদেনা,
বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে —
তখন আমায় নাইবা মনে রাখলে,
তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাইবা আমায় ডাকলে…
(২০১৯ এ ঘূর্ণিঝড় ফনীর সময়ে লেখা)