মিথলজি: সময়ের আয়নায় আঁকা মানবতার মহাকাব্য

মিথলজি: সময়ের আয়নায় আঁকা মানবতার মহাকাব্য

আমি কেন মিথলজি পড়ি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাকে ফিরে তাকাতে হয় সেই বাচ্চাকালে, যখন টিভিতে সিরিজ দেখেছি রামায়ণের যুদ্ধ, অথবা যখন ক্লাসে পড়েছি হেক্টরের বীরত্ব কিংবা মহাভারতের বিস্ময় শুনে মনে হতো—এগুলো শুধু গল্প নয়, এগুলো যেন কোনো অদৃশ্য সূত্রে বাঁধা আছে আমার নিশ্বাসের সাথে, আমার রক্তের লালিমায়। মানুষ আমাকে বলে, "এসব আজগুবি! পাগলামি!" কিন্তু আমি তো দেখি, প্রাচীন সেই গল্পগুলোর পাতায় পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুতে প্রতিফলিত হয় আজকের সকালের সূর্য। মিথলজি আমার জন্য কখনো "গল্প" নয়; এ তো এক মহাসমুদ্র, যার তলদেশে লুকিয়ে আছে মানবসভ্যতার আদি স্রোত।
 
হ্যাঁ, শুনেছি অনেকের মুখে—"দেবতা-দানবের কাহিনি, রাক্ষস-খোক্ষসের লড়াই! এসবে কি শিক্ষা মেলে?" তারা ভুলে যান, মিথলজি কোনো কল্পনার ফসল নয়; এ তো প্রাণের সত্যিকে রূপকের আড়ালে বলা এক মহাযাত্রা। যখন গ্রিক মিথলজিতে প্রমিথিউস আগুন চুরি করে মানুষকে দেন, তখন সেটা শুধু অগ্নির উপহার নয়—এটা নিষেধের প্রাচীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, জ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা। আর নর্স মিথলজিতে র্যাগনোরকের যুদ্ধ? সেটা তো শুধু রক্তাক্ত লড়াই নয়, এটা অস্তিত্বের সংকটে টিকে থাকার লালিত্য। প্রতিটি মিথের গহীনে লুকিয়ে আছে মানবমনের আদিম চিৎকার, যে চিৎকার আজও প্রতিধ্বনিত হয় আমাদের হৃদয়ে।
 
মিশরের প্রাচীন প্যাপিরাসে লেখা—"শুরুতে ছিল শুধু নুন, অন্ধকার সমুদ্র।" হিন্দু মিথলজি বলে, "অর্ধনারীশ্বরের নৃত্যে সৃষ্টির বিস্ফোরণ।" গ্রিকরা বলছে ক্যায়োসের গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া টাইটানদের কথা। আর জাপানের শিন্তো বিশ্বাসে—ইজানাগি-ইজানামির বর্শার ফোঁটায় জেগে ওঠে দ্বীপমালা। চারটি ভিন্ন সভ্যতা, চারটি ভিন্ন গল্প—কিন্তু সবার কেন্দ্রে একই প্রশ্ন: "আমরা এলাম কোথা থেকে?" মিথলজি আমাকে এই প্রশ্ন করতে শেখায়, "সৃষ্টির গল্পগুলো কি আসলে একই সূত্রের বিভিন্ন রূপ?" হয়তো আদিম মানুষ আকাশের তারা দেখে যা বুঝেছিল, আজকের বিজ্ঞানীরা হাবল টেলিস্কোপ দিয়ে তা-ই আবিষ্কার করেন—বিগ ব্যাং এর প্রতিধ্বনি।
 
সমুদ্রের গর্জন যেন আজও কানে বাজে। নুহের নৌকা, মনুর মৎস্য, ডিওক্যালিয়নের পাথর—সব গল্পেই জলোচ্ছ্বাস এসে মুছে দেয় মানবজাতিকে। কেউ বলেন, "এসব কাকতালীয় মিল।" কিন্তু যখন মেসোআমেরিকান মিথলজিতেও বন্যার পর একমাত্র জীবিত দম্পতি পুনর্বাসন করে পৃথিবী, তখন কি এটা শুধু কাকতাল? গ্রীক, মায়া, ব্যাবিলনীয়—সব সভ্যতার মাটিতে কেন এই একই আতঙ্কের ছায়া? বিজ্ঞান বলে, শেষ বরফযুগের শেষে সমুদ্রপৃষ্ঠ চারশ ফুট উঁচু হয়েছিল। মিথলজি যেন সেই স্মৃতিকে ধরে রেখেছে জলের মতই প্রবাহিত হয়ে।
 
হেলেনের জন্য ট্রয় জ্বলে, সীতার জন্য লঙ্কা পুড়ে। দুই মহাকাব্য—একই বিষাদের সুর। অ্যাকিলিসের গোড়ালি, রামের ধনুক—নায়কদের দুর্বলতা আর শক্তি একই সূত্রে গাঁথা। কেউ যদি বলে, "এসব কাল্পনিক যুদ্ধ," তাহলে আমি জিজ্ঞাসা করি—"আজকের যুগে কি ট্রয় বা লঙ্কা থেমে আছে?" দেখি না কি—ইরাক-ইরান, ইউক্রেইন-রাশিয়া কিংবা ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধেও তো হেক্টর-আকিলিসের ছায়া! মিথলজি আমাদের শেখায়: মানবতা বারবার একই ভুল করে, একই যুদ্ধে জড়ায়, কিন্তু আশার দীপটি নিভে যায় না।
 
ব্যাবিলনের মন্দিরে খোদাই করা বুধের কক্ষপথ—আজকের নাসার হিসাবের সাথে মিলে যায় মাত্র ০.০১ সেকেন্ডের তফাতে! মায়া ক্যালেন্ডার যে ভুলেছিল শুধু একটি লিপ ইয়ারে? প্রাচীন ঋষিরা কি তখনই জানতেন মহাকাশের রহস্য? মিথলজি শুধু দেবতার গল্প নয়—এটা আদি বিজ্ঞানীদের ডায়েরি, যারা নক্ষত্রের ভাষা বুঝতেন। তারা সংখ্যা লিখতেন পৌরাণিক প্রাণীর মাধ্যমে: স্কর্পিয়াস নক্ষত্রপুঞ্জে বৃশ্চিকের ছবি এঁকে তারা চিহ্নিত করতেন মহাজাগতিক বিষুব।
 
মিথলজি আমাকে দেখায়—মানুষ কতবার ঈশ্বরকে হারিয়েছে, আবার ফিরে পেয়েছে। গ্রিকরা যখন জিউসকে নিয়ে সংশয়ে ভুগেছে, তখনি লিখেছে প্রমিথিউসের করুণ পরিণতি। কিন্তু সেই সংশয়ই তো বিশ্বাসের জন্ম দেয়! রামায়ণে রাবণ বন্দী করে সীতাকে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জয় হয় ধর্মের। এটা কি শুধু গল্প? না, এটা মানবতার অনন্ত সংগ্রামের প্রতীক—অন্ধকারে আলোর জয়। মিথলজি আমাকে শেখায়: ঈশ্বর কোনো ব্যক্তিগত সত্তা নয়, তিনি সেই নীতি—যা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি পরমাণুতে বিরাজমান।
 
একসময় ট্রয়কে মনে করা হতো কাল্পনিক নগরী। কিন্তু হাইনরিখ শিলিয়েম্যান যখন তুরস্কে খনন করে বের করলেন প্রাচীন প্রাচীর, তখন পুরাণ হয়ে গিয়েছে ইতিহাস। মহাভারতের দ্বৈতবনের সন্ধান আজও চলছে রাজস্থানের মরুভূমিতে। মিথলজি হচ্ছে পাজল—প্রতিটি গল্পের টুকরো জুড়ে দিলেই ফুটে ওঠে হারানো সময়ের ছবি। যেমন: ড্রাগনের গল্প হয়তো ডাইনোসরের ফসিল দেখে ভীত আদিম মানুষের কল্পনা।
 
লোকেরা বলে, "মিথলজিতে নারী চরিত্রগুলো দুর্বল।" কিন্তু আমি দেখি সীতার অন্তর্দাহ, দ্রৌপদীর প্রশ্ন—"কোন্ ধর্ম আমাকে রক্ষা করবে?" হেলেনের জন্য নয়, হেলেনের মাধ্যমে ট্রয় যুদ্ধ আমাদের শেখায়—নারীই ইতিহাসের চালিকা শক্তি। মিথলজি আমাকে সহমর্মী হতে শেখায়: ওডিসিউসের বিশ বছর পরের ফিরে আসা আমাকে বলে, "ধৈর্য্য জয়ী হয়।" আর হনুমানের লঙ্কা দহন আমাকে শেখায়—ভক্তির শক্তি অপরাজেয়।
 
মিথলজি আমার চোখ। এই চোখ দিয়ে আমি দেখি—নক্ষত্রেরা শুধু জ্বলন্ত গ্যাস নয়, তারা আদি মানুষের স্বপ্ন। নদী শুধু জলপ্রবাহ নয়, সে গঙ্গা-নীল-টাইগ্রীসের কান্না। পৃথিবী শুধু মাটি-পাথর নয়, সে গাইয়া—গ্রিক দেবী, যার দেহ থেকে জন্ম নিয়েছে প্রাণ। মিথলজি আমাকে আস্তিক করেছে, কারণ এটা আমাকে দেখায়—প্রতিটি ধূলিকণায় লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের সমগ্র ইতিহাস। আমি মিথলজি পড়ি, কারণ আমি মানুষ—প্রশ্ন করতে চাই, আবেগে কাঁদতে চাই, আর বিশ্বাস করতে চাই: আমরা কেউই একা নই। আমাদের গল্প শুরু হয়েছিলো কোটি বছর আগে, এক দল নক্ষত্রের জন্মের মধ্য দিয়ে। সেই গল্পের শেষ নেই—যতদিন চন্দ্র-সূর্য থাকবে, ততদিন মিথলজি বেঁচে থাকবে মানুষের হৃদয়ে।
 

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!