প্রেম যে জীবনে করিনি, তা না—বরং এতবার করেছি যে, কখনো কখনো মনে হয় প্রেমও আমার ক্লান্ত হয়ে গেছে। বিয়ের আগে ছিল তারুণ্যের উত্তাপ, অবিমৃশ্যকারিতা, চোখের পলকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস; বিয়ের পরে ছিল আত্মগোপনের ভেতর দিয়ে জেগে ওঠা এক গভীর দরদ, যা সমাজের চোখে অপরাধ, অথচ হৃদয়ের কাছে নিখাদ মানুষেরই স্বীকারোক্তি। কেউ বলেছে—এটা নৈতিকতার ভাঙন, কেউ বলেছে—এটা দায়িত্ব থেকে পলায়ন। অথচ প্রেম তো কখনোই দোরগোড়ায় কড়া নেড়ে ঢোকে না, সে আসে বৃষ্টির মতো—হঠাৎ, অজানা দিক থেকে, নিজের ভারে, নিজের সুরে। আমি বারবার প্রেমে পড়েছি, কিন্তু দুর্দান্ত কোনো প্রেমের খোঁজ পাইনি—সেই প্রেম, যে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে জোয়ারের উন্মত্ত স্রোতে, আবার ঠিক প্রয়োজনের মুহূর্তে আমাকে তীরে দাঁড় করিয়ে বলবে, “এখানেই থামো, এখন নিজেকে সামলাও।”
আমি খুঁজেছি এমন এক মানুষ, যে হবে মাধবীলতার মতো—ছায়ায় ছায়ায় জড়িয়ে থাকবে, উষ্ণ গন্ধে মাথা ভরিয়ে দেবে, নীরবে আমাকে আশ্রয় দেবে; আবার সময় এলে হয়ে উঠবে রেমি—অসামান্য বাস্তব, খাঁটি, চোখে চোখ রেখে বলা সত্যের মতো কঠিন। আমি জানি, আমি তার মনের মতো প্রেমিক হতে পারব না সবদিকে; আমার মধ্যে থাকবে ভুল, থাকবে অপরিণত উত্তাপ, থাকবে দোদুল মন। কিন্তু তবু সে হবে এমন প্রেমিকা, যে আমাকে আমার ভাবালুতায় ভাসতে দেবে, স্বপ্নের জলপ্রপাতের শব্দ শুনতে দেবে, তবু আমার অন্ধকার দিনগুলোয় পেছন থেকে শক্ত হাতে টেনে ধরবে; বলবে—“ওঠো, পড়ে থাকা তোমার স্বভাব নয়।” সে হবে আমার প্রেরণা, আমার জীবনের উৎস, সেই উৎস যেখানে পাহাড়ি ঝর্ণার মতো নির্মলতা আর মরুভূমির বালিয়াড়ির মতো দীর্ঘশ্বাস একসাথে বাস করে।
আমি চাই তার চোখে থাকুক বৃষ্টি আর রোদ্দুরের মিশেল—একদিকে কোমল, অন্যদিকে দৃঢ়; যে আমার সব অজুহাত বুঝবে, তবু আমাকে অজুহাতের আড়ালে লুকোতে দেবে না। সে আমার লেখা পড়ে বলবে—এখানে ভাষা সুন্দর, কিন্তু অন্তর্গত সত্যটা কোথায়? সে আমার ক্লান্ত সন্ধ্যায় চা বানিয়ে দেবে, কিন্তু পরের দিন সকালেই আমাকে ঘুম থেকে তুলে বলবে—চল, আজ তোমাকে নতুন করে বেঁচে থাকার পরিকল্পনা শেখাই। তার সঙ্গে ঝগড়া হবে, তর্ক হবে, একে অপরকে প্রশ্ন করব—কেন এইভাবে হাঁটছ? কেন নিজেকে এভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছ? কেন তুমি এতটা স্বপ্নে থাকো, বাস্তবের সিঁড়িগুলো ধরো না? তবু দিনের শেষে আমরা একই বিছানার দুই প্রান্তে শুয়ে বুঝে যাব, আমরা আসলে একই মানচিত্রের দুই ভিন্ন দেশ—যেখানে সীমান্ত আছে, কিন্তু পাসপোর্ট লাগে না।
আমি চাই সে আমার কল্পনাকে বাতিল করে দিক না, বরং তা শান দিক; আমার স্মৃতির জীর্ণ পাতা থেকে নতুন পঙ্ক্তি তুলে আনুক। আমি চাই না সে আমাকে দেবদূত ভাবুক, আমি চাই সে আমাকে মানুষ হিসেবেই গ্রহণ করুক—ভুলে ভরা, তবু শেখার সাহস আছে; ভেঙে পড়ার ইতিহাস আছে, তবু আবার দাঁড়ানোর জেদ আছে। সে আমার সঙ্গে হাঁটবে গাউসিয়ার ভিড়ের মধ্যে দিয়ে, নীলক্ষেতের সস্তা বইয়ের গন্ধে মাথা ঘুরবে আমাদের দু’জনেরই, আর আমরা ঠিক করব—যে বইগুলো কেউ পড়ে না, সেগুলোও আমরা রাখব বুকশেলফে, কারণ অবহেলিত গল্পেরও একটা ঘর থাকা দরকার। সে আমার হাত ধরে রিকশায় বসে ঢাকার রাতের বাতাসে বলবে—শুনছ, এতদিন তুমি যাদের ভালোবেসে ফিরেছ, তারা কি তোমাকে সত্যিই পড়তে চেয়েছিল? নাকি তোমার ভাষার ওপর একটা লিপস্টিকের দাগ রেখে চলে গিয়েছিল মাত্র? আমি তার দিকে তাকিয়ে চুপ থাকব—কারণ তার প্রশ্ন ফ্লাডলাইটের মতো, যেখানে লুকোবার জায়গা নেই।
সে জানতে চাইবে আমার সমস্ত ভয়—পরিত্যক্ত হওয়ার আতঙ্ক, স্বীকৃতি না পাওয়ার তীব্র জ্বালা, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অক্ষম হয়ে পড়ার গোপন ভয়। আমি চাই সে ভয়গুলোকে উপহাস না করুক, আবার অতিরিক্ত মমতায় ঢেকে রাখারও চেষ্টা না করুক। বরং সে পাশে দাঁড়িয়ে বলুক—এই ভয়গুলোই তোমার জয় করার ক্ষেত্র, তোমার অস্তিত্বের জিমনেসিয়াম। তুমি এখানে হারবে, আবার এখানেই শিখবে জিততে। আমার সাফল্যে সে উচ্ছ্বসিত হবে, কিন্তু সাফল্যের পার্টি শেষ হতেই আমার কানে কানে বলবে—এবার নতুন করে শুরু করো, এইবার আরো কঠিন কিছু লেখো, আরো নির্মমভাবে সত্য বলো, নিজের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের উপর রাগ করো, তারপর সেই রাগকে ভাষায় পরিণত করো।
আমি এমন প্রেম চাই, যেখানে সেন্টিমেন্ট থাকবে, কিন্তু সেটা স্লথ জোয়ারের মতো, যা দিনের শেষে চরে বসে আত্মসমালোচনার নদী হয়ে যাবে। যেখানে শারীরিক উপস্থিতি জরুরি, কিন্তু তার থেকেও বেশি জরুরি মানসিক সহযাত্রা—যে আমার অবসাদগ্রস্ত সকালে কব্জি ধরে শরীরে রঙের কালি মেখে দেবে, বলবে—এই রঙগুলো শুকিয়ে গেলে তুমি আবার সুন্দর হয়ে উঠবে। যে আমার দীর্ঘ রাতের উদ্বেগে পাশে বসে থাকবে তেলাপোকার মতো নীরব ভয়ে নয়, বরং অনুশোচনার স্বচ্ছ আলো নিয়ে। যে জানে, আমি কখনোই পুরোপুরি সুস্থ হব না—কেননা, যে মানুষ লেখে, যে মানুষ ভাবতে ভালোবাসে, সে কখনোই পুরোপুরি সুস্থ থাকে না; তার মধ্যে একটা জ্বর, একটা ঘোর, একটা অপরাধবোধ কাজ করে, আর সেই অপরাধবোধই তাকে মানবিক রাখে, তাকে কাব্যিক করে, তাকে বিপজ্জনকভাবে সত্যবাদী করে তোলে।
আমি জানি, এমন প্রেম পাওয়া সহজ নয়। সমাজের টেবিলে বসে কেউ এই প্রেমের সংজ্ঞা লিখে দেয় না; পাঠ্যবইয়ের পাতায় এটা নেই; বিয়ের এনগেজমেন্ট কার্ডেও লেখা থাকে না—“তোমাকে আমি ভাসাবও, আবার তোমাকে আমি থামাবও।” আমি যাদের ভালোবেসেছি, তারা হয়তো আমাকে ভাসিয়েছে, কিন্তু টেনে ধরেনি; কিংবা টেনে ধরেছে, কিন্তু ভাসতে দেয়নি। আমি খুঁজেছি সেই ভারসাম্য, যে পারে অশ্রু আর অট্টহাসির মাঝামাঝি একটা স্বাভাবিক, ধমনীতে দপদপে জীবন বয়ে দিতে।
হয়তো কোনো একদিন সে হঠাৎ এসে দাঁড়াবে—ধরলাম না, বুঝলামও না—একটা হাঁটার মাঝখানে, একটা কফির চুমুকের অর্ধেকে, একটা বিছিন্ন বাক্যের সেমিকোলনের পাশে। সে আসবে খুবই সাধারণ ভঙ্গিতে, খুবই স্বাভাবিকভাবে—বড় কোনো ঘোষণা ছাড়া। আমি তাকিয়ে দেখব—আমার ভেতরের বিশৃঙ্খলাকে সে ভয় পাচ্ছে না; বরং একটা ছোট্ট চিরুনি দিয়ে আঁচড়ে দিচ্ছে। আমি দেখব, আমার অবিরাম আত্মবিলাপকে সে পরিণত করছে দায়িত্বে, আমার ভাঙাচোরা বাক্যগুলোকে সে নিয়ে যাচ্ছে এক দৃঢ় স্বরে। আমি বুঝব, এটাই হয়তো সেই দুর্দান্ত প্রেম—যে প্রেমে আমি ডুবে যাই, তবু ডুবে গিয়ে নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে যাই না। যে প্রেম আমাকে মুক্তিও দেয়, বাঁধনও দেয়—একই সঙ্গে। যে প্রেম আমাকে ভেতর থেকে পুনর্গঠন করে—আমার পূর্বজন্মের সব কষ্ট, সব অপরাধ, সব ব্যর্থতার ওপরে দাঁড়িয়ে নতুন একটা শরীর, নতুন একটা মন, নতুন একটা ভাষা বানিয়ে দেয়। আর আমি তাকে বলি—থাকো, আমি হয়তো তোমার মতো হতে পারব না, কিন্তু তোমাকে নিয়ে আমি আমার মতোটা হতে পারব, এবার সম্পূর্ণভাবে।