ডিভোর্স হবে না কি কোনোদিন?

মোহরানার সেই সন্ধ্যার আলো ঝলমলে কথাটি এখনো কানে বাজে—
“ডিভোর্স হবে না কি কোনোদিন?”
সেই এক সরল, ফাঁদপাতা নির্ভার বাক্য। অথচ কী প্রচণ্ড ওজন নিয়ে তা বসেছিল আমার জীবনের অন্যমনস্ক অক্ষরগুলোয়। তখন বুঝিনি, একদিন এই কথার দংশনেই আটকে যাব বছর বছরের দীর্ঘশ্বাসে। একটুখানি আশার বুনটে, একটুখানি সম্ভাবনার ধূসর রশিতে, আমি জড়িয়ে ছিলাম নিজেকে। ভেবেছিলাম, শেষমেশ সে ফিরবে, বলবে—“চলো, সব আবার শুরু করি।”
আমি ভাবতাম, আমার দুই পুটুলিকে বুকের ভেতর তুলে নেব, তাদের ঘামের গন্ধে আর নিঃশ্বাসে পূর্ণ করব ঘর। কিন্তু তারা ছিল না, আমি ছিলাম না, ছিল না আমাদের বলা না-বলা কথার মাঝের সেই গোপন মেলবন্ধন।
ছিল কেবল দুটি পথ—যেখানে আমরা হাঁটছিলাম বিপরীত দিকে, শব্দহীন পায়ে, প্রতিজ্ঞাহীন বিদায়ে।
আমার কাজ? সে তো এক রকমের মুখোশ।
আমি চাকরিটা ভালোবাসি না। ভালোবাসা দূরে থাক, তুচ্ছ বললেও যেন কম বলা হয়।
কিন্তু করতে হয়। করতে হয় কারণ বাঁচতে হয়।
বাঁচতে হয় কারণ সমাজ নামের শব্দজালে আটকে থাকা এক মানুষকে এই ছদ্ম-মর্যাদার পোশাক গায়ে দিতেই হয়।
ইদানীং অফিসটা যেন বিষণ্ন এক কূপ—প্রতিদিন আমি তাতে নামি, অথচ কোনোদিনই ওঠার রশিটা হাতে পাই না।
আমি চাই, এর আগেই চলে যাই, তার আগেই পালিয়ে যাই—যেদিন তারা বলবে, “আপনি আর প্রয়োজনীয় নন”, তার আগেই যদি বলে দিতে পারতাম—“তোমাদের আর আমার প্রয়োজন নেই।”
কিন্তু সেটা তো কেবল কবিতার পঙক্তিতে হয়, জীবনের শুষ্ক বর্ণনাপত্রে নয়।
আমার সংসার আমাকে আর টানে না।
দেয়ালের রং, খাটের চাদর, ভাতের হাঁড়ি—সবই আমার কাছে নিষ্প্রাণ।
আমি বরং পাহাড়ের দিকে তাকাতে ভালোবাসি—যেখানে নীরবতা গলায় ঝোলানো এক ঝংকার।
আমি আকাশে ডুবে থাকতে চাই—যেখানে রঙ বদলায়, কিন্তু প্রতিশ্রুতি রাখে না।
আমি লিখতে চাই—শুধু লিখতে।
অথচ আমার কলম শুকিয়ে আসে সংসারের হিসেব মেলাতে মেলাতে।
আমার যেটুকু লেখার সময় জোটে, সেটুকুও আমি অঙ্ক কষতে কষতে নষ্ট করি।
চাকরি না করলে চালানো যাবে না, চালাতে গেলে বাঁচা যাবে না, বাঁচতে গেলে লেখা যাবে না—
এ এক অসীম সমীকরণ, যার ফলাফল শুধু শূন্য।
আমার মাঝে মাঝে নিজেকেই অসহ্য মনে হয়।
নিজের ভেতরের বাসিন্দাকে যেন নিজেরই কণ্ঠে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে—
“থেমে যাও! এভাবে বাঁচা যায় না!”
কিন্তু আমি থামি না।
কারণ এ জীবন থেমে থাকলে, বাকি পৃথিবীর কাছে আমি হয়ে যাব ব্যর্থ, অথচ আমার চোখে তো আমি শুধু অবসন্ন।
আমার সমস্তটা যেন কেবল একটাই আকুতি বলে—
“একবার যদি পাহাড় হই,
আকাশের নিচে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি,
আর কেউ কিছু না বলুক,
আমার ভেতরে যেন লেখা হয়ে যায়
একটি দীর্ঘ, নীরব উপন্যাস—
যেটা কেউ পড়বে না, তবু তাতে সত্য থাকবে।”
 

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!