আমি নাকি হিসাব করে সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখি

আমি নাকি হিসাব করে সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখি

সমালোচকেরা মাঝে মাঝে বলে, আমি নাকি হিসাব করে সম্পর্ক বাঁচিয়ে রাখি। তাদের যুক্তিও অমূলক নয়। প্রমাণ হিসাবে তারা আমায় তার কথা বলে।
 
আমার দশটা বইয়ের মধ্যে আটটার প্রুফ সে দেখেছে, সম্পাদনা করেছে, বাক্য শানিয়েছে, অপ্রয়োজনীয় শব্দ কেটে দিয়েছে, দুর্বল যুক্তি মজবুত করেছে। গ্রিক মিথলজি থেকে মিশরীয়, মেসোআমেরিকান থেকে অ্যাজটেক—একটার পর একটা বইয়ের ভেতরে তার নীরব ছায়া আছে। পুরাণের সমান্তরালে, ব্যথার রাজ্যে আনন্দের খোঁজে, মিথেরা যেখানে শ্বাস নেয়—এমনকি প্রকাশিতব্য কৃষ্ণ নদীর শহরে–এর পাতায়ও তার দৃশ্যমান স্পর্শ লেগে আছে। দুই বাংলার লেখকদের নিয়ে যে সংকলন প্যাপিরাসে পুরাণ বেরিয়েছিল, তার সম্পাদনার পেছনেও ছিল তার নিরলস পরিশ্রম। বাইরে থেকে দেখলে এই সম্পর্কের ভেতর স্বার্থের গন্ধ খুঁজে পাওয়া সহজ। কিন্তু ভেতরের গল্পটা অন্যরকম।
 
শুরুটা হয়েছিল এক অনিশ্চিত সময়ের মধ্যে। কোভিডের সময়ে, চারদিকে অদৃশ্য আতঙ্ক। আমি পেন্সিলে নিয়মিত লাইভ করতাম কোভিড নিয়ে। একদিন হঠাৎ তাকে ফোন করলাম, সে তখন পেন্সিলের এডমিন প্যানেলের সদস্য। কোনো ভণিতা না করে বললাম, “আজ রাতে লাইভ, তুমি থাকবা।” সে অবাক হয়েছিল, সেটা বুঝতে পেরেছিলাম। হয়তো মনে মনে ভেবেছিল, এ কেমন মানুষ! তবুও সে থেকেছিল। সেদিনের সেই লাইভ ছিল নিছক একটি অনুষ্ঠান নয়; যেন অদৃশ্য কোনো সুতো আমাদের মধ্যে বাঁধা পড়েছিল। আমরা কেউই তখন বুঝিনি, সেই সুতো কত দূর পর্যন্ত যাবে।
 
২০২১ সালে মিশরীয় মিথলজি প্রকাশের আগে আমি দুশ্চিন্তায় ছিলাম। বইয়ের ভেতর ভুল থেকে গেলে? কোনো তথ্য যদি অসংগত হয়? সে নিজে থেকেই বলল, “আমি দেখতে পারি।” আমি সংকোচে বললাম, “আমি কিন্তু টাকা দিতে পারব না।” সে একটু কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করল, “আমি কি টাকা চেয়েছি?” সেই প্রশ্নের মধ্যে ছিল একরকম অভিমান, আবার অদ্ভুত এক আন্তরিকতাও। যেন সে কাজ চাইছে না, দায় নিচ্ছে। সেই থেকে শুরু দায় নেয়া।
 
তারপর একের পর এক ছোট ছোট দৃশ্য। বইমেলার ভিড়ে হঠাৎ কয়েকটা টিভি চ্যানেল এসে দাঁড়ায়, আমি বুঝি, কোথাও না কোথাও সে আছে। অ্যাজটেক মিথলজির প্রচ্ছদ নিয়ে বিপত্তি ঘটে, আমি তখন কলকাতায়। রাত সাড়ে এগারোটায় সে প্রেসে যায়, সমস্যা মেটায়। ফোনে শুধু জানায়, “সব ঠিক হয়ে গেছে।” ২০১৯ থেকে আমি কক্সবাজারে। দূর শহরের সমুদ্রের ধারে বসে কাজ করি। ঢাকায় দৌড়াতে হয় না, কারণ সে আছে। আমি শুধু বলি, “এটা দরকার।” সে চুপচাপ গিয়ে ব্যবস্থা করে। প্রকাশনী, প্রেস, প্রুফ—সব যেন তার অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণে।
 
দিল্লিতে অপারেশনের সময় আমার জন্মদিন এসে পড়েছিল। হাসপাতালের সাদা দেয়ালের মধ্যে আমি কোনো আয়োজনের কথা ভাবিনি। তবুও সে এমনভাবে চমকে দিয়েছিল যে আজও মনে হলে অবাক হই। কক্সবাজারে বাসা বদলের সময় দেখি ঘরের খাদ্যভান্ডার পূর্ণ। পরে জানতে পারি, দূর দেশে থেকেও এখানে কারও সঙ্গে কথা বলে সে সব গুছিয়ে দিয়েছে। আমার ফোন স্লো হয়ে গেলে একদিন হাতে তুলে দিল নতুন আইফোন। যেন এইসব ছোট ছোট যত্নের ভেতর দিয়ে সে অদৃশ্যভাবে পাশে থাকার ঘোষণা দিচ্ছে।
 
অথচ এই সবকিছুর মাঝেও আমি তার সঙ্গে ঝগড়া করি। রাগ করি। টানা পনেরো-বিশ দিন কথা বলি না। ফোন ধরি না। কখনও ব্লক করি। তবুও বন্ধুত্বটা ভাঙে না। যেন আমাদের মধ্যে কোথাও একটা গভীর গিঁট বাঁধা আছে, যা রাগে খুলে যায় না, নীরবতায় ছিঁড়ে যায় না।
 
সবচেয়ে কঠিন সময়টা এসেছিল তার জীবনে। তার বড় ভাইয়ের মৃত্যু। শোকের ভার তখনও ঘন। সেই সময় তার হাতে ছিল মিথেরা যেখানে শ্বাস নেয়–এর প্রুফ। আমি ভেবেছিলাম, কাজটা থেমে যাবে। কিন্তু থামেনি। সে পড়েছে, সংশোধন করেছে, ফাইল ফিরিয়েছে। কোনো অভিযোগ করেনি। যেন শোকের মধ্যেও দায়িত্বের আলোর একটা রেখা সে জ্বালিয়ে রেখেছিল।
 
তাই যখন কেউ বলে, এই সম্পর্কের ভেতরে স্বার্থ আছে, আমি পুরোপুরি অস্বীকার করতে পারি না। কারণ সত্যিই সে আমার পথচলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে। কিন্তু এটাও সত্য—এই বন্ধুত্বের ভিত গড়া হয়েছে বিশ্বাস দিয়ে, উপস্থিতি দিয়ে, আর এক ধরনের নীরব দায়বদ্ধতায়। সে আমার বন্ধু—ওয়াহিদা মিশা। আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মানুষ। যার কাছে আমি নির্দ্বিধায় কিছু চাইতে পারি, আর যে বিনিময়ে কখনও হিসাব তোলে না। এই সম্পর্কের ভাষা খুব সরল নয়; তবুও তার ভেতরকার সুরটা খুব পরিষ্কার—পাশে থাকার।

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!