নীলকণ্ঠের ডাক

নীলকণ্ঠের ডাক
-------------
♦️ এক
পাহাড়ের কোলে নীলাম্বরী গ্রামে রাত নামলে কেউ বাইরে বেরোয় না।
এটা নিয়ম নয়। কেউ বলেনি। কিন্তু সবাই মানে। যেভাবে কিছু কিছু সত্য বলতে হয় না — শরীর নিজেই জানে।
অর্জুন সেটা জানত না। সে এই গ্রামে এসেছিল মাত্র তিন দিন আগে, বাবার পুরনো বাড়ি বেচতে। বাবা মারা গেছেন দুই বছর। বাড়িটা পড়ে আছে। শহরে কাজ, শহরে জীবন — পাহাড়ের কোনো গ্রামে পড়ে থাকা ভিটের জন্য সময় নেই।
তাই সে এসেছিল।
কিন্তু প্রথম রাতেই সে শুনল শব্দটা।
পাহাড়ের দিক থেকে আসছে। গভীর রাতে। ঠিক কী শব্দ বলা মুশকিল — ঢাকের মতো নয়, শঙ্খের মতো নয়, মানুষের গলার মতোও নয়। কিন্তু সব কিছুর মতো একটু একটু। যেন একটাই সুর, অনেক গলায় একসাথে গাওয়া হচ্ছে।
অর্জুন উঠে জানালায় গেল।
পাহাড়ের চূড়ায় একটা আলো জ্বলছে।
নীল আলো।
সকালে সে গেল পুরোহিত মশাইয়ের কাছে।
বৃদ্ধ মানুষ। বয়স বোঝা যায় না — পঁচাত্তর না পঁচানব্বই, মুখ দেখে বলা অসম্ভব। কিন্তু চোখ তীক্ষ্ণ, কালো, প্রায় অস্বাভাবিক রকম সজীব।
“রাতের আলোর কথা জিজ্ঞেস করতে এসেছ?” পুরোহিত বললেন। অর্জুন মুখ খোলার আগেই।
অর্জুন থমকাল। “আপনি জানলেন কীভাবে?”
“যে প্রথমবার সেই আলো দেখে, সে পরদিন সকালে আমার কাছে আসে।” বৃদ্ধ চায়ের কাপে চুমুক দিলেন। “সবাই আসে।”
“এটা কী?”
পুরোহিত একটু থামলেন। বললেন, “তোমার বাবার সাথে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল। তিনি ওই পাথরের কথা কখনো বলেননি তোমাকে?”
“না।”
“তাহলে হয়তো সময় হয়নি মনে করেছিলেন।” বৃদ্ধ উঠে পড়লেন। “এখন সময় হয়েছে।”
♦️ দুই
মিথটা এইরকম —
যুগ যুগ আগে, মহাদেব এই পাহাড়ে ধ্যানে বসেছিলেন। বহু বছর। পার্বতী অপেক্ষা করেছিলেন নিচে। একদিন তিনি উঠে গেলেন দেখতে। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে দেখলেন — মহাদেব নেই। শুধু একটা পাথর আছে, এবং সেই পাথরের গায়ে মহাদেবের তৃতীয় নেত্রের ছাপ।
পার্বতী বুঝলেন। মহাদেব এখানে ছিলেন এতদিন, কিন্তু তাঁকে না জানিয়ে চলে গেছেন। তিনি কাঁদলেন।
কিন্তু যখন কাঁদলেন, তখন তাঁর কান্না সাধারণ কান্না ছিল না। দেবীর কান্না। সেই কান্না মাটিতে পড়ে অভিশাপ হয়ে গেল —
যে এই মাটিতে ভালোবাসবে, সে ডাক শুনবে।
যে ডাক শুনবে, সে চলে যাবে।
যে চলে যাবে, সে ফিরবে না।
অর্জুন শুনল। বলল, “এটা তো শুধু মিথ।”
পুরোহিত মুখ তুললেন। “তোমার বাবা এই গ্রামে এসেছিলেন একবার, কাজের জন্য। তোমার মায়ের সাথে দেখা হয়েছিল। তারপর তিনি এখানেই থেকে গিয়েছিলেন।”
“জানি।”
“জানো কি যে তোমার বাবার আগে, তোমার দাদাও এই গ্রামে এসেছিলেন? এবং থেকে গিয়েছিলেন? এবং তাঁর আগে তোমার পরদাদা?”
অর্জুন চুপ করে গেল।
“তিন পুরুষ,” পুরোহিত বললেন। “তিন পুরুষ ধরে বাইরের পুরুষ এই গ্রামে আসে। ডাক শোনে। থেকে যায়।”
“এবং চলে যায়?”
পুরোহিতের মুখে একটা ছায়া পড়ল। “সেটাই প্রশ্ন।”
তিনদিন আগে অর্জুন এসেছিল বাড়ি বেচতে।
কিন্তু এখন বুঝতে পারছে — কিছু একটা হচ্ছে।
বাড়ির দরজা সে যেভাবে বন্ধ করে যায়, পরদিন সকালে সেভাবে থাকে না। ছিটকিনি খোলা। জানালার কাচে হাতের ছাপ — বাইরে থেকে। রাতে সেই শব্দ।
এবং প্রতিদিন সেই নীল আলো।
♦️ তিন
মায়া এল চতুর্থ দিনে।
সে এসেছিল ফটোগ্রাফার হিসেবে। কোনো একটা ম্যাগাজিনের জন্য — পাহাড়ি গ্রামের লোকজীবন, পুরনো মিথ। তার ক্যামেরায় বড় লেন্স, পিঠে ব্যাগ, চোখে সেই শহুরে দূরত্ব।
অর্জুন তাকে প্রথম দেখল মন্দিরের সামনে।
সে ছবি তুলছিল মূর্তির। অর্জুনের বাবার বানানো শিবলিঙ্গ — কালো পাথর, সন্ধ্যার আলোয় অদ্ভুত জীবন্ত।
মায়া ছবি তুলছিল। হঠাৎ ক্যামেরা নামাল। বলল, নিজের মনে, প্রায়, “এটা অদ্ভুত।”
“কী অদ্ভুত?” অর্জুন বলে ফেলল।
মায়া ঘুরল। একটু চমকাল। “ক্যামেরায় কিছু আসছে না।”
“মানে?”
“মূর্তিটা ফ্রেমে আছে। কিন্তু লেন্সে তাকালে মূর্তির চোখ দুটো…” সে থামল। “দুটো জায়গায় আছে মনে হচ্ছে। একটু সরে যাচ্ছে।”
অর্জুন মূর্তির দিকে তাকাল।
সাধারণ কালো পাথর। স্থির।
কিন্তু একটা অনুভূতি হলো — যেন মূর্তিটা একটু আগে নড়েছিল, এবং সে দেখার আগেই থেমে গেছে।
মায়া থাকছিল গ্রামের একমাত্র গেস্টহাউসে।
সেই রাতে অর্জুন শুনল শব্দটা আবার। উঠল। জানালায় গেল।
পাহাড়ের চূড়ায় আলো।
কিন্তু এবার আলোর নিচে একটা মানুষের আকৃতি।
দাঁড়িয়ে আছে।
নড়ছে না।
সকালে গেস্টহাউসে গেল অর্জুন।
মায়া দরজা খুলল। চোখের নিচে কালি। ঘুমায়নি।
“তুমিও শুনেছ?” অর্জুন বলল।
মায়া একটু হাসল। ক্লান্ত হাসি। “ভোর চারটা পর্যন্ত জেগে ছিলাম। শব্দ থামেনি।”
“চলো।”
“কোথায়?”
“পুরোহিত মশাইয়ের কাছে। কিছু জিজ্ঞেস করার আছে।”
♦️ চার
পুরোহিত মশাই তাদের দেখে বললেন, “দুজন একসাথে এসেছ। এটা আগে হয়নি।”
“কী মানে?” মায়া বলল।
“মানে হয়তো এবার আলাদা।” তিনি ভেতরে গেলেন। একটি পুরনো বই নিয়ে এলেন। হাতে লেখা, পাতা হলুদ। “এটা আমার বাবার বাবার লেখা। গ্রামের ইতিহাস।”
বইটা খুললেন একটি পাতায়।
সেখানে একটি তালিকা।
নাম। সাল। এবং পাশে একটি করে শব্দ।
প্রতিটি নামের পাশে শব্দটি একই — গেছে।
অর্জুন গুনল। সাতাশটি নাম।
“এরা সবাই…”
“এই গ্রামে এসেছিল। ডাক শুনেছিল। এবং একদিন রাতে উঠে পাহাড়ে চলে গেছে। আর ফেরেনি।”
মায়ার মুখ ফ্যাকাশে। “পুলিশ?”
“প্রতিবার রিপোর্ট হয়েছে। প্রতিবার তদন্ত হয়েছে। পাহাড়ে কাউকে পাওয়া যায়নি।” পুরোহিত বইটা বন্ধ করলেন। “শুধু একটা জিনিস পাওয়া গেছে প্রতিবার।”
“কী?”
“সেই পাথরের কাছে একটা করে জুতো।”
অর্জুনের বাবার নাম তালিকায় নেই।
সে বলল, “বাবা তো মারা গেছেন এখানেই। হাসপাতালে।”
“হ্যাঁ।” পুরোহিত বললেন। “কিন্তু তোমার বাবার শেষ বছরটার কথা মনে আছে?”
“কী কথা?”
“রোজ রাতে উঠে বাইরে যেতেন। তোমার মা ঘুম থেকে উঠে দেখতেন — বিছানা খালি। ফিরে আসতেন ভোরে। কোথায় যেতেন, বলতেন না।”
অর্জুন চুপ করে গেল।
মা বলেছিলেন। বলেছিলেন, “তোমার বাবা রাতে হাঁটতে যেত।” অর্জুন ভেবেছিল ঘুমের সমস্যা। বেশি ভাবেনি।
“বাবা কি…”
“তোমার বাবা ফিরে এসেছিলেন। সবাই ফেরে না।” পুরোহিত তার দিকে সরাসরি তাকালেন। “তুমি এসেছ তাঁর ছেলে হয়ে। একই রক্ত। একই পাথরের গন্ধ।”
“মানে আমিও…”
“ডাক শুনছ কি না সেটা তুমিই ভালো জানো।”
♦️ পাঁচ
শুনছিল।
অর্জুন মানতে চাইছিল না, কিন্তু সত্য ছিল।
শুধু রাতের শব্দ নয়। দিনেও। কাজ করতে করতে হঠাৎ মনে হয় পাহাড়ের দিকে তাকাতে। খাবার খেতে গিয়ে থামা। কথার মাঝখানে থেমে যাওয়া, কান পাতা।
যেন কেউ ডাকছে। নাম ধরে। শুধু একটু বেশি জোরে ডাকলেই সাড়া না দিয়ে থাকা যাবে না।
মায়া বলল, “তুমি ঠিক আছ?”
“জানি না।”
“পাহাড়ে যাবে?”
“না।”
“কিন্তু প্রতিরাতে যেতে ইচ্ছে করছে।”
অর্জুন চমকে তার দিকে তাকাল। “তোমারও?”
মায়া চুপ করে রইল।
সেই বিকেলে মায়া তার ক্যামেরার ছবিগুলো দেখাল।
মন্দিরের মূর্তির ছবি। একটির পর একটি।
কিন্তু একটি ছবিতে অর্জুন দেখল — মূর্তির পাশে একটি ছায়া।
ধোঁয়াটে, অস্পষ্ট। কিন্তু মানুষের আকৃতির।
“এটা কখন তুলেছিলে?”
“সন্ধ্যায়। মন্দিরে কেউ ছিল না।”
অর্জুন ছবিটা বড় করল। ছায়াটার মুখের কাছে তাকাল।
হাত সরিয়ে দিল ফোন।
“কী দেখলে?” মায়া বলল।
অর্জুন কিছু বলল না।
সে দেখেছিল — ছায়ার মুখটা তার বাবার মুখের মতো।
♦️ ছয়
রাত বারোটায় গেস্টহাউসের দরজায় কড়া নাড়ল।
মায়া খুলল। অর্জুন।
“চলো।”
“কোথায়?”
“পাহাড়ে।”
মায়া একটু থামল। তারপর জুতো পরল।
পুরোহিত মশাই বলেছিলেন যেও না। বলেছিলেন রাতে পাহাড়ে কিছু বাস করে যার নাম নেই। বলেছিলেন ডাক শুনলে কান বন্ধ রাখতে।
কিন্তু ডাক যখন ভেতর থেকে আসে, কান বন্ধ করলে কী হয়?
পাহাড়ের পথ রাতে অন্যরকম।
দিনের চেনা পাথর, চেনা বাঁক — সব পালটে যায়। ছায়া পড়ে ভুল জায়গায়। চাঁদের আলো পাথরের উপর এমনভাবে পড়ে যে মনে হয় পাথরগুলো নিজেরা আলো দিচ্ছে।
অর্জুন সামনে হাঁটছিল। মায়া পিছনে।
“অর্জুন।”
“হুঁ।”
“তুমি কি শুনতে পাচ্ছ?”
সে থামল। কান পাতল।
শব্দ আসছে। সেই শব্দ। কিন্তু এখন আরও স্পষ্ট। আরও কাছে।
এবং এবার সে বুঝতে পারল — এটা একটা নাম। তার নাম।
চূড়ার কাছাকাছি এসে অর্জুন আবার দেখল সেই আকৃতিটা।
দাঁড়িয়ে আছে পাথরের পাশে। সেই নীল আলোয়।
এবার কাছে।
সে হাঁটতে লাগল।
“অর্জুন!”
মায়ার ডাক। সে থামল।
ঘুরল।
মায়ার চোখে ভয়। সে পাথরের দিকে আঙুল দেখাল।
অর্জুন ফিরে তাকাল।
আকৃতিটা চলে গেছে।
কিন্তু পাথরের কাছে মাটিতে — একটি জুতো।
তার বাবার জুতো। অর্জুন চিনল। সে ছোটবেলায় দেখেছিল এই জুতো। বাবার পুরনো পাহাড়ি জুতো।
♦️ সাত
ভোরবেলা ফিরে এসে তারা পুরোহিত মশাইয়ের দরজায় কড়া নাড়ল।
তিনি খুললেন। যেন অপেক্ষায় ছিলেন।
“দেখেছ?”
“বাবার জুতো।” অর্জুনের কণ্ঠ কাঁপছিল। “বাবা কি…”
পুরোহিত তাদের ভেতরে নিলেন। চা বসালেন। বসলেন।
“তোমার বাবা মারা গেছেন এটা সত্য। কিন্তু এই গ্রামে মৃত্যু একটু আলাদা।” তিনি বললেন। “পার্বতীর কান্নার যে মিথ — সেটা পুরো মিথ নয়। পুরো মিথটা হলো — যারা এই মাটিতে গভীরভাবে ভালোবেসেছে, তারা মরে গিয়েও এই মাটি ছেড়ে যায় না।”
মায়া ধীরে ধীরে বলল, “তার মানে সেই তালিকার মানুষগুলো…”
“গেছে বলেছি। মরে গেছে বলিনি।”
“তাহলে কোথায়?”
পুরোহিত পাহাড়ের দিকে ইঙ্গিত করলেন।
“পাথরে।”
নীরবতা।
তারপর অর্জুন বলল, “এটা পাগলামি।”
“হ্যাঁ।” পুরোহিত মাথা নাড়লেন। “কিন্তু তুমি রাতে ঘুম থেকে উঠেছ। তুমি পাহাড়ে উঠেছ। তুমি তোমার মৃত বাবার জুতো দেখেছ।” একটু থামলেন। “এর কোনটা স্বাভাবিক?”
অর্জুন চুপ।
“যারা পাথরে আছে,” পুরোহিত বললেন, “তারা ডাকে। প্রতিটি প্রজন্মে ডাকে। যারা ডাক শুনে পাহাড়ে ওঠে, তারাও পাথর হয়ে যায়।”
“কেন?”
“কারণ ভালোবাসা চায় আরও ভালোবাসা।”
♦️ আট
সেদিন বিকেলে মায়া বলল, “আমাকে কিছু দেখাবে?”
“কী?”
“তোমার বাবার কাজ।”
অর্জুন নিয়ে গেল বাড়িতে। বাবার কাজের ঘর। এখনো আছে সব — ছেনি, হাতুড়ি, অর্ধসমাপ্ত মূর্তি।
মায়া হাঁটল ঘরের ভেতরে।
একটি মূর্তির সামনে থামল।
“এটা শেষ হয়নি।”
“না।”
মূর্তিটি অদ্ভুত। পাথরের ভেতর থেকে একটা মুখ বেরিয়ে আসছে — কিন্তু বাকি শরীর এখনো পাথরে আটকে। মনে হচ্ছে মানুষটি পাথর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছে।
মায়া ক্যামেরা তুলল ছবি নিতে।
ছবি তুলল।
ক্যামেরার স্ক্রিনে তাকাল।
তারপর অর্জুনের দিকে ঘুরল। তার মুখ সাদা।
“এই মূর্তির মুখটা…”
অর্জুন এগিয়ে এল। স্ক্রিনে তাকাল।
ছবিতে মূর্তির মুখ স্পষ্ট হয়ে গেছে।
সেই মুখ অর্জুনের মুখ।
♦️ নয়
রাত।
অর্জুন ঘুমাতে পারছে না।
বাবা কেন তার মুখ খোদাই করছিলেন? জানতেন কি কিছু? মিথ কি সত্যি? পাথরে কি সত্যিই মানুষ আটকে আছে?
মাথা ঘুরছে।
তারপর শব্দ এল।
কিন্তু এবার আলাদা। এবার শুধু শব্দ নয় — একটা গলা। স্পষ্ট। চেনা।
“অর্জুন।”
বাবার গলা।
সে বিছানায় উঠে বসল। হাত কাঁপছে।
“অর্জুন, এসো।”
সে উঠে পড়ল।
জুতো পরল।
দরজা খুলল।
“কোথায় যাচ্ছ?”
মায়া।
সে গেস্টহাউস থেকে এসেছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। যেন জানত।
“বাবার গলা শুনলাম।”
“আমিও।”
অর্জুন থামল। “তুমিও?”
“আমার মায়ের গলা।” মায়ার চোখ ভেজা। “মা মারা গেছেন পাঁচ বছর আগে। তাঁর গলা শুনলাম।”
দুজনে দাঁড়িয়ে রইল।
পাহাড়ের দিক থেকে ডাক আসছে।
“যাব?” মায়া বলল।
“পুরোহিত মশাই বলেছেন যেও না।”
“কিন্তু তোমার বাবা…”
“মিথ।” অর্জুন বলল, নিজেকে বোঝাতে। “এটা শুধু মিথ।”
“তোমার বাবার জুতো মিথ ছিল?”
তারা গেল না।
ঘরে বসে রইল দুজনে। সারারাত। কথা বলল। বাবার কথা, মায়ের কথা। হারানোর কথা। যে জায়গাটা বুকে খালি, সেখানে কী থাকলে ভালো হতো।
ভোরের আগে শব্দ থামল।
তারা দুজনেই জানত — এটা শেষ নয়।
♦️ দশ
পুরোহিত মশাই সকালে বললেন, “তোমরা যাওনি। ভালো করেছ।”
“কিন্তু কতদিন?” অর্জুন বলল। “প্রতিরাতে শুনব আর কান চেপে বসে থাকব?”
“না।” পুরোহিত একটু হাসলেন। “একটা পথ আছে।”
“কী পথ?”
“পাথরটা ভাঙতে হবে।”
নীরবতা।
“সেই পাথর ভাঙলে যা আটকে আছে, মুক্ত হবে। ডাক বন্ধ হবে।” তিনি বললেন। “কিন্তু একটাই শর্ত।”
“কী শর্ত?”
“যে ভাঙবে তাকে সত্যিকারের ভালোবাসতে হবে। ভয়ে নয়। দায়িত্বে নয়। মুক্তি দেওয়ার জন্য।” পুরোহিত অর্জুনের দিকে তাকালেন। “তোমার বাবাকে ভালোবাসতে — সেই ভালোবাসা কি আছে?”
অর্জুন গলা শুকিয়ে যাওয়া অনুভব করল।
“আছে।”
♦️ এগারো
শেষ রাত।
পূর্ণিমা।
তারা উঠল তিনজনে — অর্জুন, মায়া, পুরোহিত।
অর্জুনের হাতে বাবার ছেনি। সবচেয়ে বড়টা। লোহার। বাবা সারাজীবন এটা দিয়েই সব মূর্তি বানিয়েছিলেন।
পথ চিনতে পারছিল এখন — পাথুরে, খাড়া। কিন্তু অন্ধকারেও পা হোঁচট খাচ্ছিল না।
চূড়ায় পৌঁছাল।
পাথর জ্বলছে। নীল আলো। কিন্তু আজ তীব্র। আজ পুরো চূড়াটা আলোয় ভাসছে।
এবং আকৃতিগুলো আছে।
শুধু একটা নয়। অনেক। ছায়ার মতো, ধোঁয়ার মতো — পাথরের চারপাশে দাঁড়িয়ে।
মায়া অর্জুনের হাত ধরল।
অর্জুন এগিয়ে গেল পাথরের দিকে।
ছায়াগুলো সরে দিল।
সে পাথরের সামনে দাঁড়াল। নীল আলোয় তার মুখ।
হাতুড়ি তুলল।
এবং থামল।
পাথরের গায়ে হাত রাখল।
ঠান্ডা। কিন্তু তার নিচে — কম্পন। যেন হৃদয়স্পন্দন।
অর্জুনের চোখে জল এল।
“বাবা,” সে বলল। শুধু একটুকু। শুধু একটা শব্দ।
এবং তারপর ছেনি ধরল। হাতুড়ি তুলল।
প্রথম আঘাতে পাথর ফাটল না।
দ্বিতীয় আঘাতে একটু সরল।
তৃতীয় আঘাতে —
নীল আলো বিস্ফোরিত হলো। একটা বাতাস এল, পাহাড়ের সব দিক থেকে। ছায়াগুলো — সব একসাথে — উপরে উঠে গেল। আকাশে।
এবং মিলিয়ে গেল।
নীরব হয়ে গেল সব।
অর্জুন দাঁড়িয়ে আছে। হাতুড়ি হাতে। পাথর ফাটা।
মায়া দৌড়ে এল। তার পাশে দাঁড়াল।
পাহাড়ে শুধু বাতাস। চাঁদের আলো। এবং পাখির শব্দ — ভোরের পাখি, যদিও ভোর হতে এখনো দেরি।
পুরোহিত মশাই বললেন, “শেষ হয়েছে।”
♦️ বারো
সেই রাতের পর ডাক আসেনি।
অর্জুন বাড়ি বেচল না।
সে থেকে গেল।
মায়াও ফিরে গেল না শহরে — অন্তত তখনই নয়। কিছুদিন থাকল। তারপর আরও কিছুদিন।
একদিন বলল, “আমি কি এখানে থাকতে পারি?”
অর্জুন বলল, “থাকো।”
পুরোহিত মশাই একদিন বললেন এক অদ্ভুত কথা।
“পার্বতীর অভিশাপের কথা মনে আছে? যে ডাক শুনবে, সে চলে যাবে। যে চলে যাবে, সে ফিরবে না।”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু পুরো মিথটা বলিনি।” তিনি বললেন। “অভিশাপের পরে একটা লাইন আছে।”
“কী লাইন?”
“কিন্তু যে ভালোবেসে পাথর ভাঙে, সে মুক্তি দেয় — এবং নিজেও মুক্ত হয়।”
অর্জুন চুপ করে রইল।
“তোমার বাবাও ভেঙেছিলেন,” পুরোহিত বললেন। “তাঁর বাবার জন্য। তাই তিনি ফিরেছিলেন। তাই তুমি এসেছিলে।”
“তাহলে এটা প্রতি প্রজন্মে হয়?”
“যতদিন ভালোবাসা আছে।” পুরোহিত হাসলেন। “এবং ভালোবাসা কি কখনো শেষ হয়?”
পাহাড়ের চূড়ায় পাথরটা ভাঙা।
কিন্তু সেই ফাটল থেকে — বসন্তে — একটি গাছ উঠেছে। ছোট, সবুজ।
গ্রামের মানুষ বলে সেটা মহাদেবের চোখের জল থেকে।
বিজ্ঞান বলে পাথরের ফাটলে মাটি জমে বীজ পড়েছে।
দুটোই হয়তো সত্যি।
মায়া একদিন ওই গাছের ছবি তুলল। ক্যামেরার স্ক্রিনে তাকাল।
এবার কোনো ছায়া নেই।
শুধু সবুজ পাতা। সকালের আলোয়।
সে হাসল।
সেই হাসি — ছোট, অল্প। নদীতে পাথর ছোড়ার পরের হাসির মতো।
অর্জুন দেখছিল।
সে বুঝল —
কিছু কিছু মিথ শেষ হয় না। শুধু রূপ বদলায়।
ভয় থেকে আলোয়।
পাথর থেকে গাছে।
হারানো থেকে ফেরায়।
নীলাম্বরীর পাহাড়ে এখন শুধু বাতাস।
রাতে আর শব্দ নেই।
শুধু কখনো কখনো, অনেক রাতে,
পাথরের ফাটলের ওই ছোট গাছটা
একটু কাঁপে।
বাতাসে।
নাকি অন্য কিছুতে —
কেউ জানে না।

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!