পুরাণ থেকে ইতিহাস, কিংবদন্তি থেকে বর্তমান

সতের দিনের ভ্রমণকে যখন ঠান্ডা মাথায় লিখতে বসেছিলাম, তখনই বুঝতে পেরেছিলাম—যাত্রাপথটা কেবল পায়ের নয়, ভেতরেরও ছিল। তৎক্ষণাৎ শুরু হয়ে তৎক্ষণাৎ শেষ হয়ে যাওয়া ভ্রমণটা কাগজে কলমে ফিরে আসার সময় যেন আরেকটি রূপ পেল।
 
আমার যাত্রা শুরু হয়েছিল গিজার বুকে। প্রথম দুইদিন একেবারেই পিরামিড আর মাস্তাবার রাজ্য। যেন শ্বাস-প্রশ্বাসই ছিল প্রাচীন মিশরের মৃত্যু আর অমরত্বের দার্শনিকতায় ডুবে থাকা। তৃতীয় থেকে ষষ্ঠ, কখনও সপ্তম-অষ্টম রাজবংশ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা সেই পুরাতন রাজ্যের মহাপ্রয়াণচিন্তা আমি চোখে দেখেছিলাম পাথরের ভেতরে। পাঁচটি পিরামিড, দুইটি মাস্তাবা, রহস্যময় সেরাপিয়াম আর দুটো জাদুঘর—প্রথম দুই দিনেই যেন আমি স্পর্শ করেছিলাম মৃত্যু ও পরকাল নিয়ে মিশরীয় মানসচিন্তার জন্মভূমি।
 
তারপর ভ্রমণের গতি পাল্টাল। গিজার বালুকাময় ধুলা থেকে আমি পৌঁছালাম লুক্সোর আর আসওয়ানে—মন্দিরের রাজ্যে। মধ্য ও নতুন রাজবংশের তেরোটি মন্দির, চারটি সমাধি—যার মধ্যে রাজাদের উপত্যকা, দেইর আল-মদিনার শ্রমিক গ্রাম, নুবিয়ান বসতি, এলিফ্যান্টাইন দ্বীপ, জাদুঘর সবই এসে হাজির হল আমার চোখের সামনে। প্রত্নতত্ত্ব আর পুরাণ একাকার হয়ে গেল সেই ছয় দিনে। আমার ভ্রমণের গতি তীব্র হয়ে উঠল, বেলুন রাইড আর রিভার ক্রুজও এর অংশ হয়ে গেল। কিন্তু রিলাক্সেশন কোথাও ছিল না—এ যেন একটানা আর্কিওলজিকাল হ্যাটট্রিক।
 
এরপর হঠাৎ ভ্রমণপথে বাঁক এল। কোলাহল আর ধ্বংসাবশেষ ছেড়ে আমি চলে এলাম লাল সাগরের তীরে—শার্ম আল শেইখ, দাহাব। এখানে আধুনিক পর্যটনের ঝলমলে আড়ালে ইতিহাসের ছায়া, আর ধর্মীয় স্মৃতির গাম্ভীর্য। সিনাই পর্বতের বুকে দাঁড়িয়ে বোঝা যায়—এক জায়গাতেই মুসলিম, খ্রিষ্টান আর ইহুদীদের সমান স্মরণ। সাগরপাড়ের আরাম, ধর্মীয় ঐতিহ্যের গভীরতা—এই দুই মিশে আমাকে অনুভব করাল, ভ্রমণটা শেষের দিকে চলে আসছে।
 
কিন্তু শেষের আগে আরেকবার ভিন্ন পথে যাওয়া। এবার মরুভূমি, মরুদ্যান। এখানে এসে আমি পুরাণ থেকে ইতিহাসে পদক্ষেপ রাখলাম। মরুর বুকে, সিওয়ার নীলাভ লেক আর মরূদ্যানের নিস্তব্ধতার ভেতর যেন আমার আত্মা আবার ফিরে পেল প্রাণ। এই পর্যায়ে মনে হলো, আমার যাত্রা কেবল ভৌগোলিক নয়, আত্মিকও ছিল।
 
শেষ চার দিনে আলেকজান্দ্রিয়া আর কায়রো। এখানে এসে ইতিহাস থেকে বর্তমানের মুখোমুখি হলাম। সমুদ্রতীরবর্তী গ্রিক-রোমান প্রভাবের নগর, আবার কায়রোর কোলাহল—এই দুই মিলেমিশে যেন মিশরের অতীত থেকে বর্তমানের টানাপোড়েন দেখিয়ে দিল।
 
সবশেষে ফিরে তাকিয়ে আমি বিস্ময়ে দেখলাম—আমি আমার যাত্রাপথ সাজিয়েছি অনিচ্ছাকৃত এক ধারাবাহিকতায়: পুরাতন রাজবংশের পিরামিড, নতুন রাজবংশের মন্দির, টলেমি-রোমান ইতিহাস, আরব-ফাতিমি সংস্কৃতি, তারপর বর্তমান। যেন মিশরের বিবর্তনকেই আমি হাঁটতে হাঁটতে চোখে দেখেছি—পুরাণ থেকে ইতিহাস, কিংবদন্তি থেকে বর্তমান।
 
সতের দিন কখন শেষ হয়ে গিয়েছিল, টেরই পাইনি। কিন্তু লিখতে বসে বুঝলাম, আমি আসলে মিশরের বুক দিয়ে হেঁটে এসেছি সময়ের নদী ধরে।
 
 

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!