বার্ধক্যের আয়না

 
সেদিন সন্ধ্যায় মেঘনার ঘাটে বসে ছিলাম। পাশের দোকান থেকে ভেসে আসছিল রেডিওর গজল— "প্রেম কি একা বাঁশির সুরে জাগে..."। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, পঁচিশে বৈশাখের সেই বিকেল যখন প্রথম তার চোখে ডুবে গিয়েছিলাম। সে সময় বয়স কত হবে? বাইশ? তেতাল্লিশ? না, সংখ্যাগুলো আজ মিশে গিয়েছে মাথার ভেতরকার ঝিনুক-কোঁড়ানো স্মৃতির স্তূপে। তখন তো ক্যালেন্ডার পাতার চেয়ে তার হাসিই বেশি গুনতাম। এখন ক্যালেন্ডারে হজ্বে যাওয়ার তারিখ ঘেরা দাগে ভরা, আর হাসি গোনার হিসাব মেলে না।
---
বিয়ের পরের সকালটা মনে আছে? সাদা শাড়ির প্রান্তে জড়ানো ছিল গাঁদার মালা। সে বলেছিল, "বৃষ্টি নামলে আমরা ছাতা ভাগ করে নেবো।" কে জানত, ছাতার নিচেই একদিন দূরত্বের বন্যা নামবে! বছরখানেক আগে যখন সে চলে গেল, তখন পুরনো আলবামের পাতা উল্টাতে গিয়ে দেখি— আমাদের একসাথে তোলা শেষ ছবিটায় দুজনের মাঝেই ফাঁকা জায়গা। যেন আলোকচিত্রীই জানে না কাকে ফোকাস করবে।
---
আজকে বাড়ির সামনে এলাকার পরিচিত রিকশা চালকের সাথে কথা হচ্ছিল। বলল, "স্যার, আপনি তো একলা থাকেন? ওই বাড়িটায় তরুণী আসে কদিন থেকে..."। হাসলাম। তরুণী? এই বুড়ো হৃদয়ে এখন তো প্রেম নয়, শুধু মুগ্ধতা জেগে ওঠে। যেমন কাল রাস্তায় দেখলাম এক যুগল হাত ধরে হাঁটছে। মেয়েটির স্কার্ফটা উড়ছিল বাতাসে, আর ছেলেটি তাকে রাস্তার ধুলো থেকে টেনে আনছিল। ঠিক যেন আমাদের গল্পের পুনরাবৃত্তি! কতবার তো এমন করেছি... কিন্তু এখন শুধু দূর থেকে দেখি, মনে মনে বলি— "ওই স্কার্ফটা আরেকটু বাঁধো, উড়ে যাবে!"
---
হজ্বে যাবার কথা ভাবি। কিন্তু এই বুড়ো আঙুল এখনও লিখে যায় প্রেমচিঠি— যে চিঠি কাউকে দেওয়া হয় না। স্টেশনের চায়ের দোকানে বসে লিখি: "আজও তোমার জন্য অপেক্ষা করিনি, তবু চায়ের কাপে ফেনা জমে ওঠে..."। দোকানির ছেলে জিগ্যেস করে, "আঙ্কেল, কাকে লিখছেন?" উত্তর দিই— "যৌবনকে। ওর ঠিকানা ভুলে গেছি।"
---
গত রাতে স্বপ্নে দেখলাম, নদীর ঘাটে কিশোর আমি আর বৃদ্ধ আমি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে। কিশোরটি বলল, "তুমি ব্যর্থ।" বৃদ্ধটি জবাব দিল, "না, আমি মুক্ত।" জেগে উঠে জানালা খুললাম। নিচে রাস্তায় এক জুটি মোটরসাইকেলে চেপে উড়ে যাচ্ছে। আকাশে তখন পূর্ণিমার চাঁদ— যেন প্রেমেরই প্রতিশ্রুতি, বার্ধক্যেরই আয়না।

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!