তিনি স্ফিংক্স নির্মাণ করেছিলেন!

খুফুর পরেই তার সন্তান খেফ্রেন রাজা হননি। তাদের মাঝে জেদেফ্রে ছিলেন। তিনি যে কোনো কারণেই হোক, গিজা থেকে কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত আবু রোশ নামে একটি জায়গায় চলে যান। তিনি ভুমিতে একটি গভীর খাদ নির্মাণ করে একটি অদ্ভুত ধরনের পিরামিড নির্মাণ শুরু করেছিলেন, যদিও কখনই তা শেষ করেননি।
 
খ্রেফেন রাজা হয়ে গিজায় ফিরে আসেন এবং পূর্ব পুরুষদের পিরামিড সংস্কৃতি পুনরায় চালু করেন। তিনি গ্রেট পিরামিডের মত প্রায় একই আকারের একটি পিরামিড নির্মাণ করেন, যা মাত্র ২০ ফুট ছোট, সম্ভবত তাঁর পিতা খুফুর প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ তিনি ২০ ফুট ছোট রেখেছিলেন। কিন্তু তিনি খুফুর চেয়েও বিশেষ কিছু করেছিলেন।
তিনি স্ফিংক্স নির্মাণ করেছিলেন!
 
চতুর্থ রাজবংশে, শুধুমাত্র একটি পিরামিড নির্মাণই যথেষ্ট ছিল না। এর চারপাশে একটা কমপ্লেক্স বানাতে হয়েছিল, আর তার পাশে একটা শবাগার মন্দির বা মরচুয়ারি টেম্পল। এছাড়াও একটি উপত্যকা মন্দির ছিল, যেখানে ফারাওকে সম্ভবত মমি করা হত এবং উপত্যকা মন্দির থেকে পিরামিডের সাথে সংযুক্ত পাথরে বাঁধানো একটি উঁচু রাস্তা, যা কজওয়ে নামে পরিচিত।
 
এখন, খেফ্রেনের পিরামিডের ক্ষেত্রে, পিরামিড থেকে উপত্যকা মন্দির পর্যন্ত কজওয়ে একটি সরল রেখা ছিল না। কজওয়ে তৈরীর সময়, পাথর খনন করতে গিয়ে নির্মাতারা একটি বিশাল পাথর পথিমধ্যে পেয়েছিলেন। এই বিশাল পাথরটি সরানোর বদলে তাঁরা পাথরেই খোদাই করা শুরু করেছিলেন- এভাবেই নির্মাণ করেছিলেন স্ফিংক্স।
 
স্ফিংক্স একজন মানুষের মাথা, যা মিশরীয় বিজ্ঞানীরা বেশ নিশ্চিত যে, সেটা খেফ্রেনের প্রতিমূর্তি এবং একটি সিংহের শরীরের প্রতিনিধিত্ব করে। এটাকে মানুষের বুদ্ধিমত্তা এবং সিংহের শক্তির প্রতীক বলে মনে করা হয়। আসলে সিংহকে এক ধরনের ‘ফ্যারাওনিক তালিসম্যান’ বলে মনে করা হয়, একটি টোটেম প্রাণী।
 
আজও, স্ফিংক্স রহস্যে আবৃত, যার ফলে, এর চারপাশে অনেক গুজব প্রচলিত আছে।
 
একটা অত্যন্ত সাধারণ বিতর্ক যে, মানুষ মনে করে যে স্ফিংক্স অনেক পুরানো, বর্তমানে যা ভাবা হয় -তার চেয়েও পুরানো। এটা কার্যত সত্য যে, স্ফিংক্স নির্মাণ করেছিলেন খেফ্রেনই, সে হিসেবে এর সময়কাল প্রায় ৪,৫০০ বছর আগে বলা যেতে পারে, অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ২,৫০০ সালের দিকে। যাহোক, কয়েকজন ভূতত্ত্ববিদ বিশ্বাস করেন যে, তাঁরা স্ফিংক্সে পানি ক্ষয়ের লক্ষণ লক্ষ্য করেছেন। খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ২,৫০০ সালের দিকে স্ফিংক্সের অবস্থানের নিকটে তেমন কোনো পানির উৎস না থাকায় তাঁরা মনে করেন স্ফিংক্স নির্মাণ করা হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ১০,০০০ সালের দিকে।
তবে অন্যান্য প্রত্নতত্ত্ববিদরা জোরালোভাবে ভিন্নমত পোষণ করেন যে, খ্রিস্টপূর্বাব্দে ১০,০০০ সালে কোনো উল্লেখযোগ্য মিশরীয় সভ্যতা ছিল না, যারা স্ফিংক্স খোদাই করতে পারতেন। খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ১০,০০০ সাল এমন এক সময় ছিল তখন এমনকি চাষাবাদও ছিল একটা নতুন আবিষ্কৃত ধারণা।
 
স্ফিংক্স সম্পর্কে আরেকটি সাধারণ কল্পকাহিনী হচ্ছে, ১৭৯৮ সালে নেপোলিয়ন মিশরে তাঁর অভিযানের সময় স্ফিংক্সের নাক লক্ষ্য করে গুলি করেছিলেন, যা তিনি টার্গেট অনুশীলনের জন্য ব্যবহার করছিলেন। দুটি প্রাথমিক কারণ আছে যার জন্য এটি মিথ্যা বলে বিবেচনা করা হয়। প্রথমত, নেপোলিয়ন প্রাচীন স্মৃতিস্তম্ভকে এতটাই শ্রদ্ধা করতেন যে, তিনি তাঁর সাথে ১৫০ জন বিজ্ঞানীর একটি দলকে মিশরের স্মৃতিস্তম্ভ অধ্যয়ন করার জন্য এনেছিলেন- এটা একটি সত্য, যা এই দাবিকে গুরুতর প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। দ্বিতীয়ত, আঠারো শতকের আঁকা চিত্রে দেখা যায় নাক ছাড়া স্ফিংক্স। এ চিত্র যেহেতু নেপোলিয়নের মিশর অভিযানের সময়কালের পূর্বে আঁকা, তাই প্রত্নতত্ত্ববিদেরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে- নাকটি ততদিনে প্রায় ১,০০০ বছর ধরে নিখোঁজ। ধারণা করা হয়, সম্ভবত বাতাসের কারণেই নাকের ক্ষয় হয়েছিল।
 
যদিও এখানেই শেষ নয়; অনেক ফ্রয়েডীয় মনোবিজ্ঞানী ধারণা পোষণ করেন, স্ফিংক্স একজন নারী। এই ভুল ধারণার উদ্ভব হয় কারণ, স্ফিংক্সটিত মাথায় ‘নেম’ নামে পরিচিত উষ্ণীষ (মাথার পরার কাপড়, অনেকটা পাগড়ি ধরনের) ছিল, জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ক্রীতদাস এবং দাসদের চিহ্নিত করে, প্রকৃতপক্ষে তা ছিল রাজকীয়, ফারাওদের সাধারণ অভ্যাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
 
পৌরানিক কাহিনী বা ভ্রান্ত ধারণাই একমাত্র পদ্ধতি নয় যা দিয়ে স্ফিংক্স তার ভক্তদের বিভ্রান্ত করে চলেছে। বেশিরভাগ মানুষ শুনে বিস্মিত হয় যে, স্ফিংক্সের দাড়িও ছিল! যদিও প্রায় সব মিশরীয়রা দাড়ি পরিষ্কারভাবে কামানো রাখতেন, এমনকি ফারাওরাও দাড়ি কামাতেন, তবুও রাজকীয় নীতি অনুযায়ী তাঁরা একগুচ্ছ নকল দাড়ি রাখতেন। খুব ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, স্ফিংক্সের চিবুকের নিচে খাঁজ কাটা দাগ আছে! বর্তমানে স্ফিংক্সের দাড়ি দু’জায়গায় আছে- প্রথমটি প্রায় তিন চার ফুট দৈর্ঘ্যের যা কায়রোর মিশরীয় জাদুঘরে আছে, বাকী অংশটি ব্রিটিশ জাদুঘরে সংরক্ষিত। যদিও সেখানে সেটা পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত করা হয় না এবং নজির স্থাপনের ভয়ে তারা সেটি মিশরীয় সরকারকেও ফেরত দিচ্ছেন না (যদি মিশর পরবর্তীতে রোসেটা প্রস্তরফলক ফেরত চায়?)।
 
আমি যখন গিজা কমপ্লেক্সে গিয়েছিলাম, প্রবেশ পথ দিয়ে ঢুকেই সবার প্রথমে স্ফিংক্সের দেখা পাই। কিন্তু কাছে যেতে পারিনি, কারণ এটা এখন সর্বসাধারণের জন্য বন্ধ আছে। যদিও শুনেছি, বিশেষ অনুমতি নিয়ে কিংবা বাড়তি টাকা দিয়ে টিকেট কেটে দেখা যায়। যদিও মিশরের সরকারী ওয়েবসাইটে আমি টিকেটের বিষয়টি দেখিনি। যে কারণে প্রচন্ড ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও "ড্রিম স্টেলা" আমার দেখা হয়নি!
 
ছবিটি আমার তোলা। এটা ভেবে খুব ভালো লাগছে যে, "মিশরীয় মিথলজি-আদি থেকে অন্ত" বইয়ের বেশ কিছু ছবি আমার নিজের তোলা ছবি দিয়ে প্রতিস্থাপিত হবে!
 

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!