শার্ম আল শেইখে

শার্ম আল শেইখে এসেছিলাম এখান থেকে সিনাই পর্বতে যাব বলে। অরিজিনাল প্ল্যান একটু চেইঞ্জ হয়েছে। আমার প্ল্যান ছিল শার্মে এসে বিকাল ৭টা পর্যন্ত ১২ ঘন্টার মিনিভ্যান যাত্রার ধকল কাটাবো, তারপর ট্যুর এজেন্সির সাথে বিকাল ৭টার দিকে সিনাইয়ের দিকে যাত্রা করব। সেখানে সেইন্ট ক্যাথেরিন শহর থেকে রাত দুইটার সময় পাহাড়ে ক্লাইম্বিং শুরু হবে। মোসেস মাউন্টেনে উঠে অসাধারণ সূর্যোদয় দেখব।
 
কিন্তু রাতেই প্ল্যান চেইঞ্জ হল। ট্যুর এজেন্সি থেকে বলা হল সিনাইয়ের ট্যুর শুধুমাত্র শুক্রবার, রবিবার আর বুধবার হয়; কারণ শনিবার, সোমবার আর বৃহস্পতিবার সেইন্ট ক্যাথেরিন মনাস্টেরি খোলা থাকে। তাই শনিবারের বুকড করা আমার ট্যুর হবে না। আমাকে ট্যুর করতে হলে শুক্রবার অথবা রবিবার করতে হবে। দুটোই আমার জন্য অসম্ভব ছিল। শুক্রবার লুক্সোর থেকে যাত্রা করব, ইনফ্যাক্ট আমি তখন মিনিভ্যানে; আর রবিবার সিয়া ওয়াসিসের দিকে যাব।
 
ট্যুর অপারেটর, আর বুকিং এজেন্সি viator এর সাথে দফায় দফায় মেসেজ আদান প্রদান চললো। ট্যুর অপারেটর থেকে আমাকে অন্য একটা প্যাকেজের অফার দিল - রেড সিতে স্কুবা ডাইভিং,স্নোরকেলিং কিংবা মরুভূমিতে সাফারি। আমি একটাতেও রাজি হলাম না। আমার এক কথা ছিল আমি ৫ তারিখে বুকিং ২ সপ্তাহ আগে থেকে দিয়েছি। সেইভাবে সব প্ল্যান করেছি। এখন বললে তো হবে না যে, ৫ তারিখে হবে না! বরঞ্চ সেইন্ট ক্যাথেরিন মনাস্টেরিতে যাব না, তবুও ৫ তারিখেই মাউন্টেনে যাব।
 
আমি যখন মিনিভ্যানে, রাত ১১টায় একবার ট্যুর অপারেটর আমাকে বলেই ফেললো, প্যাকেজ ক্যান্সেল করতে, সে আমার পুরো টাকা রিফান্ড করবে। ঠিক পরের মুহূর্তেই জানালো, ৫ তারিখে একটা টীম প্রাইভেট ট্রিপে সন্ধ্যা ৭টায় যাবে, রবিবার ভোর চারটায় ব্যাক করবে। আমি রাজি হয়ে গেলাম। এরপর মোবাইল সুইচড অফ করে এসিবিহীন (এসি থাকার কথা ছিল, কিন্তু কাজ করছে না! ) অপরিসর মিনিভ্যানে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম।
ভোর ৫টায় শার্ম আল শেইখে পৌঁছালাম। তখন মোবাইল অন করে আমি যেখানে থাকব, তার মালিককে ফোন দিলাম, "আমি আসতাছি"। এরপর প্রাকৃতিক কাজের প্রচন্ড চাপে দিশেহারা হয়ে সেখানে যাবার আগে ওয়াশরুম খুঁজতে খুঁজতে কিছুটা সময় গেলো। এদিকে ফোন বাজছে, আর আমি চাপের জন্যে ফোন না ধরে ওয়াশরুম খুঁজে বেড়াচ্ছি - অচেনা অজানা জায়গায়, যেটা এমনকি আমার দেশ না, এমনকি সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, পুলিশও ইংরেজি জানে না!
 
৩০ মিনিট সময় লাগলো আমার। এরপর ফাঁকা রাস্তায় একটা ট্যাক্সি পেলাম,ড্রাইভার ইংরেজি জানে না। অদ্ভুতভাবে বুঝাইয়া যখন আমার গেস্ট হাউজের দিকে রওনা দিয়েছি, আবার ফোন!
গত ৩০মিনিট ধরে ইনিই ফোন করছিলেন। ট্যুর গাইড। আমার গেস্ট হাউজে গিয়ে আমাকে পায়নি। আমি বললাম, ট্যুর তো শুরু হবে সন্ধ্যা ৭টায়, শেষ হবে ভোর ৪টায়। সে বললো, না, শুরু হচ্ছে সকাল ৭টায়, শেষ হবে বিকাল ৪টায়। আমি যাব কি না।
 
যার জন্য আসলাম এতো কষ্ট করে, আব যাব না! তাকে বললাম, আপনি আবার আমার পিকআপ পয়েন্টে আসেন। আমি ১০মিনিটের মধ্যে আসতাছি। সে বললো, আমার পিকআপ পয়েন্ট থেকে চলে গেছে, অনেক দূর পথ, সে আসতে পারবে না। আমি যদি যেতে চাই, আমাকে এক জায়গায় আসতে হবে। ড্রাইভারকে ফোন দিলাম। সে জায়গাটা বুঝে নিল।
আমি এরপর ১০ মিনিটের মধ্যে আমার গেস্ট হাউজে গেলাম।অফিসিয়ালি চেকইনও করিনি। ব্যাকপ্যাকারটা ফালায় রেখেই আবার দৌড়।
 
শুধু সূর্যোদয় ছাড়া মূল প্ল্যানের সবই হয়েছে। বরঞ্চ দাহাবও ঘুরা হল। দাহাবে রেড সির পাশে বসে লাঞ্চ করলাম।
 
রাতের ট্যুর হয়ে গেল দিনের ট্যুর, দেখা হলো অসাধারণ কিছু জিনিস। বোনাস হলো দাহাব আর রেড সির পাশে লাঞ্চ। আল্লাহ যা কিছু করে, ভালোর জন্যই করে। 
 
 

Related Articles

এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে

এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!