উপমহাদেশে তুলনামূলক ভাবে আমাদের দেশেই মেডিকেলে পড়াশোনার খরচ বোধহয় কম এবং একটু সহজও বটে। যে কারণে এখানে নেপাল, ভুটান এমনকি ভারত থেকেও ছেলে মেয়েরা ডাক্তারী পড়তে আসে। আমাদের ব্যাচেও তেমনি আটজন নেপালী পড়তে এসেছিলো। এরা এসে খুব দ্রুত এখানকার নিয়মনীতি, আচার-ব্যবহার সব কিছুর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে থাকে।
আমাদের ফিজিওলজী লেকচারার স্যার ছিলেন রাজীব স্যার, জে-১ ব্যাচেরই স্টুডেন্ট। খুব সহজ সরল ছিলেন। পড়ানোর সময় মেয়েদের দিকে তাকাতেন না, কখনো কোনো ছাত্র বা ছাত্রীকে ধমক দিয়েছিলেন কি না তাও মনে পড়েনা। সে তিনি প্রথম ক্লাসে নেপালীদের বাংলায় জিজ্ঞেস করলেন, “ তোমরা বাংলা বুঝতে পারো?” তারা আটজনেই মাথা দুই পাশে নাড়ালো, আমরা যেভাবে ‘না’ বলি। স্যার খুব বিপদে পড়ে গেলেন। অসহায়ভাবে বললেন, “ঠিক আছে, আমি ইংরেজীতে পড়াচ্ছি, কিন্তু আমার বলতে একটু সমস্যা হবে, তোমরা কিছু মনে করো না”। উনি কিন্তু খুব ভালোভাবেই পড়ালেন, চমৎকার ইংরেজী বললেন। লেকচার শেষে নেপালীদের আবার জিজ্ঞেস করলেন, “ Do you follow me? My lecture?” তারা আগের মতোই মাথা দুই পাশে নাড়ালো। এবার শুধু রাজীব স্যার নয়, আমরা সবাই খুব বিস্মিত হলাম।
পরে একজন নেপালী দাঁড়িয়ে যা বললো তার সারমর্ম হলো, দুই পাশে মাথা নাড়ানো মানে ‘হ্যা’-বোধক, আর সামনে পিছনে মাথা নাড়ানো মানে ‘না’-বোধক, ঠিক আমাদের বিপরীত। এরপর থেকেই কেউ যদি কখনো জিজ্ঞেস করতো কিছু বুঝতে পেরেছি কি না, মাথা দুই পাশে নাড়াতাম।
আমাদের নেপালী বন্ধুরা, যাদেরকে একসময় আর নেপালী মনে হতো না, বাঙ্গালীই ভাবতাম
নেপালী বন্ধুদের মধ্যে একজনের নাম ছিলো একরাজ লুইটেল। আমরা যখনই ওকে জিজ্ঞেস করতাম ওর বাবা কি করে, উত্তর ছিলো ‘ফার্মার’। অনেকদিন পরে জানতে পারলাম ফার্মার মানে দু’তিনটা চা বাগানের মালিক। একরাজকে নিয়ে আরেকটি মজার ঘটনা আছে। একবার একরাজ এক বাংলাদেশীর কাছে বাংলা ভাষায় সবচেয়ে খারাপ গালি কি জানতে চাইল। বলা হলো, ‘দুলাভাই’। এরপর থেকেই একরাজ যখন কারো সাথে রাগারাগি করতো, ‘তুই আমার দুলাভাই’ বলে সমানে চেচাতো। যেদিন এক সিনিয়র নেপালী ভাইয়ার কাছ থেকে জানতে পারলো ‘দুলাভাই’ মানে ‘জিজাজী’, সেদিন ওর ধারে কাছেও আমাদের কারো যাবার সাহস ছিল না।