এই ছবিটা গ্রেট পিরামিডের কিংস চেম্বারে তোলা। ছবিটি আমার অনুরোধে তুলে দিয়েছিলেন এক ফ্রেঞ্চ ভদ্রলোক। ছবি তোলা শেষ হলে তার সঙ্গীনি হাসতে হাসতে বললেন, "এবার টিপস দাও"।
মিশরে এই টিপস প্রথা মিশরের অনেক দিনের ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি হলেও এটা এখন ট্যুরিস্টদের কাছে আতঙ্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। এই প্রথা চালু হয়েছিল মিশরের নিম্নবিত্তদের আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য। বিশেষ করে যারা হোটেলে কাজ করে, ট্যাক্সি চালায়, ট্যুরে হেল্প করে, গাইড - এদের জন্য। যারা আসলে কম টাকা পায় চাকরী করে। এবং টিপস নিয়ে না কি বার্গেইনিং করলে এরা অভদ্র ভাবে। টিপসের পরিমাণ সাধারণত বলা হয়ে থাকে ২০ ইজিপির মতো। কিন্তু এখন এরা কমপক্ষে ২০০ ইজিপি ছাড়া মুখ ভার করে, অনেক সময় তো ডলার চেয়ে বসে!
ব্যথা যখন গাঢ় নীল রাত্রির মতো চেপে বসে, মানুষ শিকড়হীন গাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকে—মাটি নেই, পাতা ঝরে, কিন্তু পতনের শব্দটুকুও পৃথিবী শুনতে পায় না। তার হৃদয়ে তখন অদৃশ্য ভূমিকম্প; চোখের সামনে ভাঙাচুরা হয়ে যায় সমস্ত আলোর শহর, অথচ ঠোঁট দুটো জমে যায় বরফের ভাষায়। সে হাত বাড়ায় সাহায্যের দিকে, কিন্তু হাতের আঙুলেই লেখা থাকে অদৃশ্য এক কবিতা: "আমি একা।"
মিশর আমার জন্য শুধু একটি দেশ নয়, এটি এক মহাকাব্যিক প্রতীক্ষা—যেখানে প্রতিটি বালিকণা ফারাওদের পদচিহ্নের গল্প কানে ফিসফিস করে, নীল নদের জল ক্লিওপেট্রার অশ্রুতে লবণাক্ত, আর মরুভূমির বাতাসে ভাসে আলেকজান্ডারের শেষ নিঃশ্বাস। তবুও কেন যেন এই স্বপ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতেই আমি কাঁপি। হয়তো ভয়, এই বিশাল ইতিহাসের সামনে আমি একা এক ফোঁটা জল; হয়তো ভাবি, এই নশ্বর দেহে কি এত বড় এক মহাদেশের গল্প ধারণ করা সম্ভব?
পৃথিবীর বুকে একদিন জঙ্গলের গহিনে জেগে উঠেছিল সূর্যকিরণে ঝলমলে পিরামিড, রাজপ্রাসাদের মাথায় উড়েছিল রাজকীয় পতাকা, মাটির নীচে শায়িত ছিল স্বর্ণখচিত সমাধি। মায়ারা লিখে গিয়েছিলেন মহাকালের গণনা, গড়ে তুলেছিলেন পাথরের শহর—যেখানে প্রতিটি চিহ্ন ছিল নক্ষত্রের ভাষা। কিন্তু একদিন সেই মহিমান্বিত নগরীগুলো নিস্তব্ধ হয়ে গেল। মন্দিরের গায়ে জমে থাকা শিশিরের মতো মায়ারা মুছে গেলেন ইতিহাসের পাতায়। কেন? কী সেই রহস্য, যা আজও প্রত্নতাত্ত্বিকদের হৃদয়ে জ্বালায় অমীমাংসিত প্রশ্ন?
আমি কেন মিথলজি পড়ি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাকে ফিরে তাকাতে হয় সেই বাচ্চাকালে, যখন টিভিতে সিরিজ দেখেছি রামায়ণের যুদ্ধ, অথবা যখন ক্লাসে পড়েছি হেক্টরের বীরত্ব কিংবা মহাভারতের বিস্ময় শুনে মনে হতো—এগুলো শুধু গল্প নয়, এগুলো যেন কোনো অদৃশ্য সূত্রে বাঁধা আছে আমার নিশ্বাসের সাথে, আমার রক্তের লালিমায়। মানুষ আমাকে বলে, "এসব আজগুবি! পাগলামি!" কিন্তু আমি তো দেখি, প্রাচীন সেই গল্পগুলোর পাতায় পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুতে প্রতিফলিত হয় আজকের সকালের সূর্য। মিথলজি আমার জন্য কখনো "গল্প" নয়; এ তো এক মহাসমুদ্র, যার তলদেশে লুকিয়ে আছে মানবসভ্যতার আদি স্রোত।
সেদিন সন্ধ্যায় মেঘনার ঘাটে বসে ছিলাম। পাশের দোকান থেকে ভেসে আসছিল রেডিওর গজল— "প্রেম কি একা বাঁশির সুরে জাগে..."। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, পঁচিশে বৈশাখের সেই বিকেল যখন প্রথম তার চোখে ডুবে গিয়েছিলাম। সে সময় বয়স কত হবে? বাইশ? তেতাল্লিশ? না, সংখ্যাগুলো আজ মিশে গিয়েছে মাথার ভেতরকার ঝিনুক-কোঁড়ানো স্মৃতির স্তূপে। তখন তো ক্যালেন্ডার পাতার চেয়ে তার হাসিই বেশি গুনতাম। এখন ক্যালেন্ডারে হজ্বে যাওয়ার তারিখ ঘেরা দাগে ভরা, আর হাসি গোনার হিসাব মেলে না।
Subcategories
এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে
এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!
