প্রেম যে জীবনে করিনি, তা না—বরং এতবার করেছি যে, কখনো কখনো মনে হয় প্রেমও আমার ক্লান্ত হয়ে গেছে। বিয়ের আগে ছিল তারুণ্যের উত্তাপ, অবিমৃশ্যকারিতা, চোখের পলকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস; বিয়ের পরে ছিল আত্মগোপনের ভেতর দিয়ে জেগে ওঠা এক গভীর দরদ, যা সমাজের চোখে অপরাধ, অথচ হৃদয়ের কাছে নিখাদ মানুষেরই স্বীকারোক্তি। কেউ বলেছে—এটা নৈতিকতার ভাঙন, কেউ বলেছে—এটা দায়িত্ব থেকে পলায়ন। অথচ প্রেম তো কখনোই দোরগোড়ায় কড়া নেড়ে ঢোকে না, সে আসে বৃষ্টির মতো—হঠাৎ, অজানা দিক থেকে, নিজের ভারে, নিজের সুরে। আমি বারবার প্রেমে পড়েছি, কিন্তু দুর্দান্ত কোনো প্রেমের খোঁজ পাইনি—সেই প্রেম, যে আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে জোয়ারের উন্মত্ত স্রোতে, আবার ঠিক প্রয়োজনের মুহূর্তে আমাকে তীরে দাঁড় করিয়ে বলবে, “এখানেই থামো, এখন নিজেকে সামলাও।”
মোহরানার সেই সন্ধ্যার আলো ঝলমলে কথাটি এখনো কানে বাজে—
“ডিভোর্স হবে না কি কোনোদিন?”
সেই এক সরল, ফাঁদপাতা নির্ভার বাক্য। অথচ কী প্রচণ্ড ওজন নিয়ে তা বসেছিল আমার জীবনের অন্যমনস্ক অক্ষরগুলোয়। তখন বুঝিনি, একদিন এই কথার দংশনেই আটকে যাব বছর বছরের দীর্ঘশ্বাসে। একটুখানি আশার বুনটে, একটুখানি সম্ভাবনার ধূসর রশিতে, আমি জড়িয়ে ছিলাম নিজেকে। ভেবেছিলাম, শেষমেশ সে ফিরবে, বলবে—“চলো, সব আবার শুরু করি।”
আমি ভাবতাম, আমার দুই পুটুলিকে বুকের ভেতর তুলে নেব, তাদের ঘামের গন্ধে আর নিঃশ্বাসে পূর্ণ করব ঘর। কিন্তু তারা ছিল না, আমি ছিলাম না, ছিল না আমাদের বলা না-বলা কথার মাঝের সেই গোপন মেলবন্ধন।
ছিল কেবল দুটি পথ—যেখানে আমরা হাঁটছিলাম বিপরীত দিকে, শব্দহীন পায়ে, প্রতিজ্ঞাহীন বিদায়ে।
আমার পরবর্তী বই। আমার মিশর।
অনেকদিন ধরে বিবলিওফাইল–কে বলে আসছিলাম, এবার থ্রিলার দেব। সেই লেখা চলছে ঠিকই। কিন্তু হঠাৎ মিশর এক ধাক্কায় সব পাল্টে দিল।
আমি মিশরে ঘুরতে যাইনি। গিয়েছিলাম দেখতে—চেনা ইতিহাসকে নতুন চোখে, জানা পুরাণকে নতুন নিঃশ্বাসে। বুঝতে পেরেছি, মিশরের প্রতিটি বালিকণায়, প্রতিটি প্রাচীরে, প্রতিটি নিঃসীম নিরবতায় পুরাণ নিজস্ব নিয়মে শ্বাস নেয়।
এই ছবিটায় যে তরুণী হেসে আছে, আলো ছুঁয়েছে যার কপোল, নাম তার নাবিলা। আমার সবচেয়ে ছোট বোন। জন্মের ব্যবধান এক যুগের; আমি আর নিশাত তার থেকে এতটাই দূরে, যেন ভিন্ন এক প্রজন্মের সূচনা সে। আব্বু চলে যাবার পর, পৃথিবীর রূক্ষতাকে বুকে নিয়ে বেড়ে ওঠা সেই মেয়েটির ভবিষ্যৎ নিয়ে রাতের পর রাত বুকের ভেতর কাঁটা হয়ে বিঁধত। কীভাবে এত বড় হবে? কীভাবে পাড়ি দেবে জীবনের কঠিন পথগুলো? কীভাবে খুঁজে নেবে তার নিজস্ব ছন্দ? অজানা এক আতঙ্কে ছেয়ে থাকত মনের আকাশ।
হ্যালো, আমি সাইয়েদার বড় ভাই। একটু আগে নাবিলাকে নিয়ে লিখেছিলাম, আর এখন লিখছি সাইয়েদাকে নিয়ে! আরেহ! সাইয়েদাই হচ্ছে নিশাত, কিংবা নিশাতই হচ্ছে সাইয়েদা!
সাইয়েদা এখন একজন থেরাপি ইন্টার্ন। সে দক্ষিণ এশিয়ান কানাডিয়ানদের জন্য ভার্চুয়াল কাউন্সেলিং করে। আমি নিজে দেখেছি কীভাবে আমাদের সংস্কৃতি, পারিবারিক চাপ, বা আর্থিক টানাপোড়েন মন ভেঙে দিতে পারে। সাইয়েদা সেসব গভীর থেকে বোঝে– কারণ সে শুধু পড়েইনি, আমাদের পরিবারের সংগ্রামও তার চোখের সামনেই হয়েছে।
আজ ২২ জুন। নিশাতের জন্মদিন।
আজকের এই দিনে, পৃথিবী তার আলো ছড়িয়ে দিয়েছিল আমাদের সংসারে—অথচ সে আলোটা ঠিক সূর্যের মতো ছিল না। এটা ছিল একটু নরম, একটু নিঃশব্দ, একটু রূপালি আলো—যেটা কেবল তারা (star) দেয়। নিশাত, আমার ছোট বোন নয় শুধু, বরং জীবনের সেই পাতাটা, যেটা খুললে আমি ফিরে পাই ছেলেবেলার ঘ্রাণ, মা’র কণ্ঠস্বর, আর একটা সময়, যেখানে ঘড়ির কাঁটা কেবল খেলার জন্যই চলতো।
আমরা বয়সে কাছাকাছি, অথচ মাঝেমাঝে মনে হয়, সে যেন আমার আগের জন্মের ছায়া—যে আমাকে বুঝে ফেলে, এমনকি আমি চুপ করে থাকলেও। জীবনের অনেক কঠিন সময়েও, ওর একটুখানি হাসি যেন বাতাসে রেখে যাওয়া কাগজের নৌকার মতো—ডুবে যেতে যেতে আবার ভেসে ওঠে।
Subcategories
এস এম নিয়াজ মাওলা সম্পর্কে
এস এম নিয়াজ মাওলা। পেশায় একজন চিকিৎসক আর নেশায় একজন নবীন কথা সাহিত্যিক। পেশাগত জীবনটাকে মানুষ সিরিয়াসলি নেয়। এই পেশাগত জীবনের টানেই ছোটবেলা থেকে এত পড়াশুনা করে, এত এত ডিগ্রী নিয়ে একটা পর্যায়ে এসে মানুষ থিতু হয়। ক্যারিয়ার চলতে থাকে আপন গতিতে। সময়টাও চলতে থাকে নিজের মতো করে। ব্যাপারটায় কেমন একটা বাধ্যবাধকতার গন্ধ পাওয়া যায়। তাই না? পেশাগত জীবনটাকে চাবি দিয়ে ঠিকঠাক না রাখলে পুরো জীবনটাই তছনছ হবার পথে চলে যায়। অথচ এই জীবনটাকে ঠিক রাখতে মনের খোরাকের ব্যবস্থাও করতে হয়! নিয়াজ ভাইয়ের এই মনের খোরাক হচ্ছে লেখালেখি!